নভেম্বর ২১, ২০২৫, ০৭:৩৬ পিএম
পটুয়াখালী জেলায় খেজুর রস উৎপাদন দিনে দিনে কমে যাওয়ায় শীতকালীন এই ঐতিহ্য হারানোর শঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। জেলার বিভিন্ন উপজেলার মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দক্ষিণাঞ্চলে খেজুর গাছের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
এর ফলে ঐতিহ্যবাহী খেজুর রস ও গুড় উৎপাদন ব্যাহত হয়ে বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। যদিও চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু উৎপাদন কমে যাওয়ায় উৎপাদকরা পর্যাপ্ত আর্থিক লাভ করতে পারছেন না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, জেলায় বর্তমানে খেজুর গাছের সংখ্যা ১ লাখ ২৮ হাজার ৩৫টি। গত মৌসুমে আহরিত গুড়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ৪.১ মেট্রিক টন।
জেলা কৃষি অফিস জানায়, উল্লেখযোগ্য অংশের রস সরাসরি বাজারে বিক্রি হওয়ায় গুড় উৎপাদন তুলনামূলক কম হয়েছে। বাউফল উপজেলার চাষি আবদুল করিম জানান, আগে তাঁর ৩০ থেকে ৩৫টি গাছ থেকে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ লিটার রস পাওয়া যেত, যা এখন ১৬টি গাছ থেকে ৪ থেকে ৬ লিটারে নেমে এসেছে। রসের দাম লিটার প্রতি ১০০ থেকে ১২০ টাকা হলেও উৎপাদন কমে যাওয়ায় লাভের সুযোগ অনেক কমে গেছে।
দশমিনা উপজেলার অভিজ্ঞ গাছি সামছুল হাওলাদার জানান, একসময় একটি মৌসুমে ২০০ থেকে ২৫০ কেজি পাটালি গুড় তৈরি হতো, যা এখন ৫০ থেকে ৭০ কেজিতে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে পাটালির কেজি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং নলেন গুড় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও সীমিত সরবরাহের কারণে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কলাাপাড়া উপজেলার তরুণ চাষি ছামীম মৃধা বলেন, চাহিদা বাড়লেও দক্ষ গাছি সংকট ও রসের ঘাটতি উৎপাদন বাড়াতে বাধা দিচ্ছে। গলাচিপা উপজেলার গুড় উৎপাদক আলম খান বলেন, ঢাকা ও বরিশালের পাইকারেরা আগাম অর্ডার দিয়ে রাখলেও রসের সরবরাহ কম থাকায় তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয় চাষি ও উৎপাদকরা বলছেন, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নতুন গাছ রোপণ না করা এবং অযত্নে পড়ে থাকা গাছের উচ্চ মৃত্যু হারই খেজুর গাছ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ। ৮৮ নং বাউফল দাসপাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রাবেয়া খাতুন কচি এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, চাষি ও গাছি সংকটের কারণে এই ঐতিহ্যটি হারিয়ে যেতে পারে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো আর খেজুর রসের প্রকৃত স্বাদ জানতে পারবে না।
বাউফল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিলন জানান, তারা নতুন গাছ রোপণে উৎসাহ দিচ্ছেন এবং আধুনিক নলী প্রযুক্তি ব্যবহার করে রস আহরণ অন্তত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করছেন। কৃষির উপপরিচালক ড. মো. আমানুল ইসলামও ঐতিহ্য সংরক্ষণে নতুন করে খেজুর গাছ রোপণ অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন এবং সরকার বিভিন্ন প্রণোদনার মাধ্যমে রোপণ কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। চাষি ও গাছি প্রশিক্ষণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করলে দক্ষিণাঞ্চলে খেজুর রস ও গুড় উৎপাদন পুনরায় বাড়ানো সম্ভব হবে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন