সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬,

দেশি মুরগির খামারে কোটি টাকা লাভের গোপন কৌশল ও সম্পূর্ণ গাইডলাইন

কৃষি ডেস্ক

জুন ১৪, ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম

দেশি মুরগির খামারে কোটি টাকা লাভের গোপন কৌশল ও সম্পূর্ণ গাইডলাইন

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার এক সফল তরুণ উদ্যোক্তা তারেক জামান ভালো অংকের বেতনের স্বনামধন্য একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে দিয়ে আজ সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী। নিজের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি নিজ বাড়িরে আঙিনায় গড়ে তুলেছেন বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত সফল দেশি মুরগির খামার যার নাম টিএম এগ্রো। তার এই নতুন প্রকল্পটি শুধু তাকেই অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল করেনি বরং স্থানীয় বেকার যুবক ও তরুণদের জন্য বড় ধরনের একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। 

আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে একটি দেশি মুরগির প্রজেক্টকে শতভাগ লাভজনক ব্যবসা হিসেবে রূপ দেওয়া যায় তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এই খামারি।চাকরি জীবনের আরামদায়ক কমফর্ট জোন থেকে বের হয়ে আসা তারেকের এই খামারের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না।বর্তমানে তার এই বিশেষ প্রকল্পটি মুক্ত ও আবদ্ধ দুই ধরনের মিশ্র পদ্ধতি সমন্বয় করে অত্যন্ত চমৎকারভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। 

প্রায় তিন বিঘা পরিমাণ বিশাল আয়তনের একটি জমিতে চতুর্দিকে শক্ত নেট দিয়ে ঘিরে এই উন্মুক্ত চারণভূমি তৈরি করা হয়েছে যেখানে মুরগিগুলো প্রাকৃতিকভাবে চলাফেরা করার সমান সুযোগ পায়। খামারের এই খোলামেলা জায়গায় ইচ্ছেমতো রোদ ও মাটির সংস্পর্শে বিচরণের কারণে মুরগির মাংসের ভেতরের আঁশ বেশ শক্ত হয় এবং সাধারণ মানুষের কাছে এর দেশি স্বাদ বজায় থাকে। উন্মুক্ত পরিবেশের কারণে এই মুরগিগুলোর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি থাকে এবং এ কারণেই নরসিংদী জেলা ছাড়াও রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য দূরবর্তী জেলাগুলোতে এর বিশাল বাণিজ্যিক চাহিদা তৈরি হয়েছে।

খামারের ভেতরে ৫০০ বর্গফুট আয়তনের একটি ছোট বিশেষ শেড রয়েছে যেখানে শুধু ডিম পাড়ার উপযোগী দেশি মুরগিগুলোকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।এখানে প্রজনন প্রক্রিয়ার সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রতি সাতটি ডিম পাড়া মুরগির সাথে একটি করে সুস্থ মোরগ রাখার বৈজ্ঞানিক নিয়ম কঠোরভাবে পালন করা হচ্ছে। ডিম পাড়া অবস্থায় মুরগির শরীরের পুষ্টি চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন গড়ে ৬০ গ্রাম করে সুষম খাবার সরবরাহ করা হয়ে থাকে যার মধ্যে ধান, ভুট্টা ভাঙা, চালের খুদ ও রেডিমেড লেয়ার ওয়ান ফিড অন্যতম। নিয়মিত ডিম উৎপাদনের কারণে মুরগির শরীরে যে উচ্চমাত্রার ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দেয় তা পূরণের জন্য জিংক, ক্যালসিয়াম এবং বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের বিশেষ মিশ্রণ দেওয়া হয়। 

সাধারণত বাজারে প্রচলিত পদ্ধতিতে শুধু ডিম বিক্রি করে দেশি মুরগির খামারে বড় অঙ্কের লাভ করা বেশ কঠিন কাজ।এই হিসাবটিকে পুরোপুরি লাভজনক করতে তারেক জামান ডিম বিক্রির প্রচলিত ধারা থেকে বের হয়ে এসে সরাসরি হ্যাচিং বা বাচ্চা ফোটানোর ব্যবসায় রূপান্তর ঘটিয়েছেন।খামারের মূল প্যারেন্টস মুরগি থেকে ডিম সংগ্রহ করে নিজস্ব আধুনিক ইনকিউবেটর মেশিনের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক উপায়ে নতুন বাচ্চা ফোটানো হয়। বর্তমানে তাদের হ্যাচিং ইউনিটে মোট পাঁচটি বড় আকারের ইনকিউবেটর মেশিন রয়েছে যার মাধ্যমে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৬ হাজারেরও বেশি নতুন দেশি মুরগির বাচ্চা সফলভাবে উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। 

খামার থেকে উৎপাদিত এই উন্নত জাতের বাচ্চাগুলো একদিনের আকার, এক মাসের আকার অথবা আরও বড় করে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে স্থানীয় ও দূরবর্তী বাজারে চড়া মূল্যে বিক্রি করা হয়। কেউ যদি বাচ্চা ফোটানোর প্রযুক্তি ছাড়া শুধু ডিম বিক্রি করতে চান তবে তাকে অবশ্যই বিশাল কোয়ান্টিটি বা অনেক বড় সংখ্যায় মুরগি পালন করতে হবে।পোল্ট্রি শিল্পের সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো বিভিন্ন ধরনের ছোঁয়াচে রোগ বা মড়ক যা খামারকে এক রাতে নিঃশেষ করে দিতে পারে।

অতীতের প্রাচীনকালে সঠিক প্রতিষেধক ও আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার অভাবে রানীক্ষেত বা গাম্বুরার মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার দেশি মুরগি মারা যেত। এই বড় চ্যালেঞ্জটি মোকাবেলা করার জন্য টিএম এগ্রোতে মুরগি অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার বদলে অসুস্থ হওয়ার আগেই শতভাগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের নীতি অনুসরণ করা হয়। কোনো প্রকার কেমিক্যাল বা অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব এড়াতে তারা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও ভেষজ উপাদানের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। মুরগির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে নিয়মিত পানির সাথে কাঁচা রসুন, খাঁটি মধু, কালোজিরা, আদা ও সজনে পাতার রস খাওয়ানো হয়।

সবগুলো মুরগি যেন এই ভেষজ মিশ্রিত পানি সমানভাবে পান করতে পারে সেজন্য খামারে একটি বিশেষ কৌশল ব্যবহার করা হয়ে থাকে।সকালে প্রথমে মুরগিগুলোকে সাধারণ শুকনা খাবার দেওয়া হয় এবং এরপর দীর্ঘ এক থেকে দুই ঘণ্টা পানি দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়। এতে মুরগিগুলোর মধ্যে তীব্র পিপাসা তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে ভেষজ পানি দেওয়া মাত্রই শতভাগ মুরগি একযোগে সেই পানি পান করে নেয়। দেশি মুরগির চোখের একটি পরিচিত এবং মারাত্মক সমস্যার নাম কোরাইজা যাতে আক্রান্ত হলে চোখে তীব্র ব্যথার কারণে মুরগির খাওয়ার রুচি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। সাতশত গ্রামের একটি ভালো ও সুস্থ মুরগি এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র তিনশত গ্রামে নেমে আসে যার জন্য তারা প্রচলিত ওষুধের চেয়ে সরিষার তেল ও লবণ একসাথে মিশিয়ে চোখে লাগানোর প্রাকৃতিক উপায়ে দ্রুত নিরাময় পাচ্ছেন।

বাণিজ্যিক শেড ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তারা আধুনিক দোতলা বিশিষ্ট একটি আধুনিক ভবন নির্মাণ করেছেন যার প্রতি তলার মোট আয়তন ৩ হাজার ২০০ বর্গফুট।দুই তলা মিলিয়ে মোট ৬ হাজার ৪০০ বর্গফুট আয়তনের এই বিশাল শেডের ভেতরে ছোট ও বড় সব ধরনের জাত মিলিয়ে একসঙ্গে প্রায় ১৫ হাজার মুরগি পালন করা সম্ভব। সাধারণত মাংসের জন্য বড় করা মুরগির ক্ষেত্রে প্রতিটির জন্য শূন্য দশমিক ৭৫ থেকে এক বর্গফুট জায়গার প্রয়োজন হয় এবং সেই হিসেবে প্রতি ১০০ বর্গফুটে ১২৫টি মুরগি রাখা যায়। খামারের শেডগুলো সবসময় পূর্ব-পশ্চিম দৈর্ঘ্য বরাবর তৈরি করা বাধ্যতামূলক কারণ বাংলাদেশের স্বাভাবিক বাতাস দক্ষিণ দিক থেকে এসে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়। মুরগির মলমূত্র থেকে উৎপন্ন ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া গ্যাস শেডের মেঝে থেকে সর্বোচ্চ তিন ফুট উচ্চতা পর্যন্ত ওপরে ওঠে যা সঠিক ভেন্টিলেশন না থাকলে মুরগির চোখ ও শ্বাসনালীতে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করে।

পূর্ব-পশ্চিম শেড নির্মাণের ফলে দক্ষিণ দিকের বাতাস সরাসরি ভেতরে প্রবেশ করে ক্ষতিকর গ্যাস উত্তর দিক দিয়ে বের করে দেয় এবং মুরগি সুস্থ থাকে।টিএম এগ্রো বর্তমানে মূলত চারটি প্রধান বাণিজ্যিক আইটেম নিয়ে দেশের বাজারে অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। প্রথমটি হলো একদিনের নতুন বাচ্চা যা মূলত অভিজ্ঞ খামারিদের কাছে বিক্রি করা হয় কারণ এদের ব্রুডিং করার জন্য বাড়তি দক্ষতার প্রয়োজন হয়। দ্বিতীয়টি হলো এক মাসের তৈরি বাচ্চা যাতে অলরেডি তিনটি প্রধান প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন, ঠাণ্ডার ডোজ ও ভিটামিন কোর্স সম্পন্ন করা থাকে যা একদম নতুন ও অনভিজ্ঞ খামারিদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ। তৃতীয় আইটেমটি হলো আর মাত্র ১৫ থেকে ২০ দিন পর ডিম দেবে এমন রেডি ডিমের মুরগি এবং চতুর্থটি হলো সরাসরি সুপার শপ প্রসিডিউর মেইনটেইন করে ঢাকায় হোম ডেলিভারি দেওয়া ফ্রোজেন মাংসের মুরগি।

বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কেউ নতুন খামার শুরু করতে চাইলে তারেক জামানের পরামর্শ হলো অন্তত ৩০০টি মুরগি নিয়ে যাত্রা শুরু করা উচিত।খামারের বাস্তব সুবিধা, অসুবিধা এবং দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জগুলো সঠিকভাবে অনুধাবন করার জন্য এই ন্যূনতম সংখ্যাটি অত্যন্ত জরুরি কারণ খুব কম সংখ্যায় এটি শুরু করলে প্রকৃত লাভ-ক্ষতির সমীকরণ বোঝা যায় না। তবে বাসাবাড়ির পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা মেটানোর জন্য যে কেউ অনায়াসে ১০ থেকে ২০টি মুরগি একই ভ্যাক্সিনেশন নিয়ম মেনে পালন করতে পারেন। সঠিক জেনে-বুঝে নিয়মতান্ত্রিক সুষম খাবার, সময়মতো ভ্যাকসিনেশন এবং প্রাকৃতিক ভেষজ চিকিৎসার সঠিক মেলবন্ধন ঘটাতে পারলে দেশি মুরগির খামারকে একটি অত্যন্ত লাভজনক দীর্ঘমেয়াদি পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া সম্ভব। আগামী দিনে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এই ধরনের টেকসই কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার দেশের যুবসমাজের ভাগ্য বদলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।