সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ০৩:১৭ পিএম
সাদা ফুলের থোকায় লুকিয়ে থাকা কালো দানাকে পুঁজি করে পেঁয়াজ উৎপাদনে দেশে অনন্য অবস্থান তৈরি করেছে রাজবাড়ী জেলা।
চাষিদের ভাষায় এই বীজ `কালো সোনা`। বর্তমানে শুধু রাজবাড়ী জেলাতেই প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে উন্নত মানের পেঁয়াজ বীজের আবাদ হয়। দোআঁশ ও বেলে-দোআঁশ মাটির বিশেষ উর্বরতা এবং উপযোগী আবহাওয়ার কারণে এই জনপদে পেঁয়াজ, পেঁয়াজের চারা ও বীজ উৎপাদন দিন দিন বাড়ছে। ফলে পেঁয়াজ উৎপাদনে জেলাভিত্তিক তালিকায় রাজবাড়ী এখন সারাদেশে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।
বীজতলায় দানা ফেলার পর অংকুরোদ্গম হয়ে পেঁয়াজের চারা তৈরি হয়। চারাকে একটি স্বতন্ত্র লাভজনক ফসল হিসেবেও আবাদ করেন অনেক কৃষক। পানি সেচ ও সঠিক নিকাশের সুবিধাযুক্ত জমিতে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে শীতকালীন মূলকাটা পেঁয়াজের চারা এবং ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে হালি পদ্ধতির চারা তৈরি করা হয়। ঠান্ডা জলবায়ু পেঁয়াজের জন্য সবচেয়ে অনুকূল হলেও এখন শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা—তিন ঋতুতেই পেঁয়াজ চাষের বিস্তার ঘটেছে। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চারা উৎপাদন শুরু হয় ফেব্রুয়ারি থেকে এবং বর্ষাকালীন চারা রোপণ উপযোগী হয় জুলাই মাস থেকে।
বীজ বপনের ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর কৃষকেরা মাটি থেকে শিকড়সহ অক্ষত অবস্থায় চারা তুলতে শুরু করেন। তোলার পর হাটে বিক্রি, পরিবহন ও জমিতে লাগানোর সুবিধার্থে চারাগুলো আঁটি বেঁধে প্রস্তুত করা হয়। প্রতি বিঘা জমিতে পেঁয়াজ রোপণ করতে প্রায় ছয় থেকে সাত মণ চারার প্রয়োজন হয়। পেঁয়াজের শিকড় মাটির পাঁচ থেকে সাত সেন্টিমিটারের বেশি গভীরে যায় না, তাই মূল জমি খুব বেশি গভীর করে চাষ করার দরকার পড়ে না। আগাছামুক্ত, ঝুরঝুরে সমতল মাটি পেঁয়াজ আবাদের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। পেঁয়াজ চাষের আদর্শ তাপমাত্রা ১৫ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
জমিতে প্রয়োজনীয় সার ও বালাইনাশক প্রয়োগের পর লোহার পাতের আঁচড়া টেনে সমান দূরত্বে সারিবদ্ধ রেখা তৈরি করা হয়। পেঁয়াজ রোপণ ও পরিচর্যার কাজে দলবদ্ধ কৃষি শ্রমিকেরা সকাল থেকে মাঠে ঘাম ঝরান। মাঠের কাজকে গতিশীল রাখতে কৃষকের বাড়ি থেকে শ্রমিকদের জন্য দুপুরে খাবার সরবরাহ করার দীর্ঘদিনের সামাজিক রীতি রয়েছে। ডিম-খিচুড়ি কিংবা ভর্তা-ভাত খেয়ে শ্রমিকেরা পুনরায় কাজে নামেন। ভূগর্ভস্থ পানি পাম্পের সাহায্যে তুলে জমিতে সেচ দেওয়া হয়। জমিতে রসের অভাব দেখা দিলে প্রতি ১০ থেকে ১৫ দিন পর পর সেচ দিতে হয়। পেঁয়াজ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না, তাই জমিতে ড্রেন বা নিকাশ নালা রাখা বাধ্যতামূলক।
রাজবাড়ীতে বছরে প্রায় সাড়ে চার লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। পুরো বাংলাদেশে পেঁয়াজের মোট বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৩৬ লাখ টন। পেঁয়াজের বৈজ্ঞানিক নাম অ্যালিয়াম সেপা। এটি বর্ষজীবী ভেষজ উদ্ভিদ, যার গোড়ায় থাকা মাংসল শল্কপত্র পরিবেষ্টিত রূপই হলো খাদ্যোপযোগী কন্দ। পেঁয়াজ গাছের ঘাড় বা পাতা শুকিয়ে হেলে পড়লে বুঝতে হবে ফসল উত্তোলনের সময় হয়েছে। গ্রীষ্মকালীন জাতের ক্ষেত্রে বীজ বপন থেকে ফসল সংগ্রহে সময় লাগে ৯৫ থেকে ১১০ দিন। অন্যদিকে শীতকালীন জাতের ক্ষেত্রে সময় লাগে ১৩০ থেকে ১৪০ দিন।
জাতভেদে প্রতি হেক্টরে প্রায় ১৩ টন, একরে ৪৮ কুইন্টাল এবং প্রতি বিঘায় গড়ে ৫০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। মাঠ থেকে পেঁয়াজ উত্তোলনের পর প্রক্রিয়াজাতকরণে নারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কন্দ থেকে ডগার দিকে দুই সেন্টিমিটার রেখে কাঁচি বা বঁটি দিয়ে পাতা কেটে ফেলা হয়। একজন দক্ষ নারী শ্রমিক সারাদিনে প্রায় পাঁচ মণ পেঁয়াজ কাটতে পারেন। কাটার পর এক সপ্তাহ ধরে চলে রোদে শুকানো, ঝাড়াই ও গ্রেডিংয়ের কাজ। পেঁয়াজ একটি পচনশীল পণ্য হওয়ায় সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাজার স্থিতিশীলতার প্রধান শর্ত। বাতাস চলাচলের সুবিধাযুক্ত ঘরে বাঁশের মাচায় ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার পুরু করে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা হয়।
মাচায় বিছানোর জন্য বাঁশের চটার বিশেষ বানা তৈরি করা হয়। ১০ হাত দৈর্ঘ্য ও পাঁচ হাত প্রস্থের এসব বানা স্থানীয় বাজারে মানভেদে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। সংরক্ষিত পেঁয়াজ নিয়মিত উল্টে-পাল্টে দেখতে হয় এবং পচা পেঁয়াজ সরিয়ে ফেলতে হয়। পেঁয়াজ বাণিজ্যে ফড়িয়া, ব্যাপারী, আড়তদার, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ী—এই পাঁচ স্তরের মধ্যস্থতাকারী কাজ করেন। এর মধ্যে মোকামের মূল নিয়ন্ত্রক হলেন আড়তদার।
রাজবাড়ীর সোনাপুর ও জামালপুর বাজারসহ বিভিন্ন হাটে মৌসুমে কোটি কোটি টাকার পেঁয়াজ বেচাকেনা হয়। প্রতিযোগিতামূলক দরে পাইকারেরা পেঁয়াজ কেনেন। বর্তমান বাজারে প্রতি মণ পেঁয়াজ এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ট্রাক ও পাওয়ার টিলারে করে এসব পেঁয়াজ প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়। দেশে পেঁয়াজের মোট চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে এখনও প্রায় তিন লাখ টনের বার্ষিক ঘাটতি রয়েছে। সেই ঘাটতি পূরণে এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে রাজবাড়ীর পেঁয়াজ চাষিরা জাতীয় অর্থনীতিতে অনন্য ভূমিকা পালন করছেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন