সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬, ০১:০৭ পিএম
উচ্চ শারীরিক বৃদ্ধি, দৃষ্টিনন্দন শারীরিক গঠন এবং দুধ ও মাংসের বিপুল উৎপাদনের জন্য দেশে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে উন্নত বিটল জাতের ছাগল। ময়মনসিংহ সদর উপজেলায় পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি শখের বশে এমনই একটি সমন্বিত বিটল ছাগলের আধুনিক খামার গড়ে তুলেছেন এক চিকিৎসক। চার বছর আগে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই খামারে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৫টি উন্নত বিটল ছাগল রয়েছে।
অনলাইন থেকে কেনা তিনটি ক্রস জাতের ছাগল দিয়ে তিনি প্রাথমিক যাত্রা শুরু করেছিলেন। শুরুতে ছাগলের রোগবালাই, খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বুঝতে তিনি নাটোর থেকে অনলাইনে তিনটি ছাগল সংগ্রহ করেন। দেড় বছর ধরে সেগুলো লালন-পালনের মাধ্যমে চিকিৎসা, টিকা ও সার্বিক পরিচর্যার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এরপর তিনি উন্নত জাতের আসল বিটল সংগ্রহের সাহস পান। বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তান থেকে সংগৃহীত রক্তলাইনের পাঠা ও পাঠি তার খামারে বংশবৃদ্ধি করছে। বিটল জাতের ছাগলের অন্যতম প্রধান শারীরিক বৈশিষ্ট্য হলো মার্বেল পাথরের মতো ধবধবে সাদা চোখ এবং পেছনের দিকে বাঁকানো সুঠাম শিং।
এদের মুখমণ্ডলে বাঁকানো রোমান নোজ থাকে, যা দেখতে ধনুকের মতো বাঁকা। লম্বা চওড়া ঝোলানো কান, সোজা দীর্ঘ লেজ এবং সুউচ্চ কাঠামোর কারণে এই জাতটি সহজেই অন্য জাত থেকে পৃথক করা যায়। খামারে থাকা প্রায় ১৪ মাস বয়সী একটি কালো রঙের পাঠা মাত্র দুটি দাঁতেই প্রায় আড়াই হাত চওড়া ও দীর্ঘ অবয়ব পেয়েছে। সাধারণত এই জাতের একেকটি প্রাপ্তবয়স্ক ছাগলের উচ্চতা ৩৮ ইঞ্চি বা তারও বেশি হয়ে থাকে। খামারের ছাগলগুলো দৈনিক গড়ে প্রায় তিন লিটার পর্যন্ত দুধ দিতে সক্ষম।
দেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগলের দুধ বাচ্চার চাহিদা মেটানোর পর বাড়তি থাকে না, কিন্তু বিটল ছাগলের ক্ষেত্রে বাচ্চা বড় হওয়ার পরও প্রচুর পরিমাণে উদ্বৃত্ত দুধ পাওয়া যায়। প্রজনন বৈশিষ্ট্যে দেশি ছাগল বছরে দুবার বাচ্চা দিলেও বিটল ছাগল প্রায় দেড় বছর সময়ে দুবার বাচ্চা প্রসব করে। প্রথমবার একটি বাচ্চা দিলেও পরবর্তী সময়ে সাধারণত দুটি করে বাচ্চার জন্ম দেয়। তবে বাচ্চার শারীরিক বৃদ্ধির হার অত্যন্ত দ্রুত। আড়াই মাস বয়সী একটি কালো-সাদা ডাব্বা রঙের পাঠা বাচ্চার ওজন ইতিমধ্যে ২৫ কেজিতে পৌঁছেছে। ছাগলের পুষ্টি নিশ্চিতে দানাদার খাদ্যের পাশাপাশি নিয়মিত পিংক সল্ট বা খনিজ লবণ ঝুলিয়ে রাখা হয়।
দানাদার খাবারের মিশ্রণে ছোলা, মসুর, সরিষার ভুষি ও মটরশুটির ভুষি সমন্বয় করা হয়। বর্ষার দিনে কাঁচা ঘাসে আর্দ্রতা ও সর্দি লাগার ঝুঁকি থাকায় কাঁচা ঘাস কমিয়ে সাইলেজ সরবরাহ করা হয়। পাঠা ছাগলের পেশি গঠন ও প্রজনন সক্ষমতা ধরে রাখতে আস্ত ছোলা ও নিয়মিত খেজুর খাওয়ানো হয়। অন্যদিকে গর্ভবতী ছাগলকে আঘাত থেকে বাঁচাতে আলাদা কক্ষে রেখে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স এবং জিংক সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হয়। খামারটিতে মাটি থেকে সাড়ে তিন ফুট উঁচুতে মাচা তৈরি করে ছাগল রাখা হয়।
ছাগলের প্রস্রাব ও বর্জ্য থেকে তীব্র ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া গ্যাস তৈরি হয়, যা তাদের নিউমোনিয়া ও চর্মরোগের প্রধান কারণ। মাচা পদ্ধতির কারণে মলমূত্র নিচে পড়ে যাওয়ায় খামার সম্পূর্ণ দুর্গন্ধমুক্ত ও শুকনো থাকে। নবজাতক বাচ্চাদের বড় ছাগলের গুঁতো থেকে বাঁচাতে তৈরি করা হয়েছে আলাদা ছোট সুরক্ষিত চেম্বার। এ ছাড়া প্রজনন ব্যবস্থাপনায় প্রতি ১০টি পাঠির জন্য একটি স্বাস্থ্যবান পাঠা রাখা হয়, যাতে শারীরিক শক্তি ক্ষয় না হয় এবং উন্নত মানের বাচ্চা পাওয়া যায়। ছাগলকে যত্রতত্র মানুষের অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ না করার বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা জানিয়েছেন ওই চিকিৎসক।
তিনি উল্লেখ করেন, সামান্য জ্বর বা পাতলা পায়খানায় খামারিরা রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন এবং কোর্স শেষ না করে মাঝপথে বন্ধ করে দেন, তার ফলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। এই প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া পরবর্তী সময়ে ছাগলের মাংসের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করে জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। পশুর যেকোনো অসুস্থতায় নির্ধারিত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী ভেটেরিনারি ওষুধ ব্যবহারের আহ্বান জানান তিনি। নিয়মিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তিনি পিপিআর রোগের টিকা বছরে একবার এবং ক্ষুরারোগের টিকা ছয় মাস পরপর বছরে দুবার প্রয়োগ করেন।
বাণিজ্যিক বাজারদরে দেশে উন্নত বিটল পাঠির দাম শুরু হয় প্রায় ৭০ হাজার টাকা থেকে। শারীরিক গঠন ও বয়সের ভিত্তিতে একেকটি ভালো পাঠার বাজারমূল্য এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা বা তার চেয়েও বেশি হয়ে থাকে। খামারের বাইরে স্থানীয় আগ্রহী কৃষকদের মাঝে বর্গা হিসেবে ১১টি ছাগল লালন-পালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয় খামারিরা ছাগল বিক্রি থেকে লভ্যাংশ পাচ্ছেন এবং পাঠির ক্ষেত্রে জন্মানো বাচ্চা সমান ভাগে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। নতুন খামারিদের অনলাইনে প্রতারিত না হয়ে সরাসরি একাধিক খামার পরিদর্শন করে উচ্চতা, ওজন ও দুধের সঠিক উৎপাদন নিশ্চিত হয়ে ছাগল কেনার পরামর্শ দিয়েছেন এই উদ্যোক্তা।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন