অক্টোবর ১৬, ২০২৬, ১১:১৯ পিএম
মাঠজুড়ে চিরাচরিত সোনালি ধানের সমারোহের মাঝে এবার রাজশাহীর এক গ্রামীণ জনপদে দোল খাচ্ছে ব্যতিক্রমী এক ফসল। জেলাটির দুর্গাপুর উপজেলায় প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে পুষ্টিগুণে ভরপুর ব্ল্যাক রাইস বা কালো চালের ধান আবাদ শুরু হয়েছে। সাধারণ ধানের চেয়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে এর কদর ও অর্থমূল্য অনেক বেশি হওয়ায় নতুন এই দানাদার শস্য ঘিরে স্থানীয় চাষি এবং কৃষি কর্মকর্তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ।
উচ্চ বাজারমূল্য ও চাহিদার কারণে এই ফসল স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা জাগিয়েছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুর্গাপুর পৌরসভার দেবীপুর গ্রামের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সোহান ১৬ কাঠা জমিতে এবং মাড়িয়া ইউনিয়নের পালি গ্রামের চাষি আবু তালেব প্রায় আড়াই বিঘা জমিতে এই অপ্রচলিত ধানের আবাদ করেছেন। নতুন এই খাদ্যশস্যের নিবিড় পরিচর্যা, উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাজার সংযোগ তৈরিতে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় কৃষি দপ্তর।
কৃষক আবু তালেব জানান, ব্ল্যাক রাইস এই অঞ্চলে একেবারেই নতুন হওয়ায় কোনো বাড়তি ঝুঁকি না নিয়ে তিনি আড়াই বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করেছেন। ফলন আশানুরূপ হলে এবং বাজারে প্রত্যাশিত দর পাওয়া গেলে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে ভালো মুনাফা অর্জন সম্ভব হবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে এই উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখলে এলাকার অন্য চাষিরাও উদ্বুদ্ধ হয়ে বাণিজ্যিকভাবে এই ধান চাষে এগিয়ে আসবেন।
কৃষকদের প্রাথমিক মাঠ মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রতি বিঘায় প্রায় ১৬ থেকে ১৮ মণ ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতি মণ ধানের সম্ভাব্য বিক্রয়দর চার হাজার টাকা পাওয়া গেলে বিঘা প্রতি মোট আয় হতে পারে প্রায় ৬৪ থেকে ৭২ হাজার টাকা। তবে সার, বীজ ও শ্রমিকের উৎপাদন ব্যয় সমন্বয় করার পর প্রকৃত লাভ নির্ভর করবে ফসল কাটার সময়ের চূড়ান্ত ফলন ও তৎকালীন বাজারদরের ওপর।
কৃষি বিজ্ঞানীদের তথ্যানুযায়ী, ব্ল্যাক রাইসে অ্যান্থোসায়ানিন নামের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রঞ্জক উপাদান প্রাকৃতিকভাবে উপস্থিত থাকার কারণে এই ধানের চালের রং কালো বা গাঢ় বেগুনি দেখায়। চালটিতে উচ্চমাত্রার খাদ্য-আঁশ ও জরুরি পুষ্টি উপাদান সংরক্ষিত থাকায় সারা বিশ্বের স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছে এটি বিশেষ সমাদৃত। তবে এর বাণিজ্যিক বিকাশ নিশ্চিত করতে টেকসই ও কার্যকর বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পৌরসভা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদ এবং পালি ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুমিনুজ্জামানের সরাসরি উপস্থিতিতে ধানক্ষেত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কৃষিবিদদের ধারণা, আবহাওয়া শেষ পর্যন্ত অনুকূল থাকলে দুর্গাপুরের স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে ব্ল্যাক রাইস নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবনী জানান, দুর্গাপুরে ব্ল্যাক রাইসের সূচনা কৃষিতে ফসল বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ইতিবাচক এক পদক্ষেপ। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি কৃষকদের আধুনিক চাষপদ্ধতিতে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। চলতি মৌসুমের চূড়ান্ত ফলন, মোট উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারে ভোক্তাদের চাহিদার মাত্রা বিশদভাবে পর্যালোচনা করে আগামীতে এই আবাদের পরিধি আরও সম্প্রসারণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ঐতিহাসিকভাবে রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি মূলত বর্ষানির্ভর আউশ ও আমন ধানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। একসময় জেলার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের উঁচু বরেন্দ্র এলাকা মূলত একক ফসলি বা অনাবাদি পড়ে থাকত। পরবর্তীতে গভীর নলকূপ স্থাপন ও আধুনিক সেচ অবকাঠামো সম্প্রসারণের ফলে সেখানে বোরো ধানের বৈপ্লবিক বিস্তার ঘটে। বরেন্দ্রভূমির রুক্ষ মাটির উপযোগী একাধিক উচ্চফলনশীল বোরো জাত উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। বরেন্দ্র এলাকার সেই ধারাবাহিক কৃষি রূপান্তরের পথ ধরেই এবার উচ্চমূল্যের বাণিজ্যিক ফসল হিসেবে দুর্গাপুরে কালো চালের আবাদ শুরু হলো।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন