সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬,
কৃষিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি

সৌরশক্তিচালিত সেচ ব্যবস্থায় কৃষি বিপ্লব বরেন্দ্রে কমছে ব্যয় বাড়ছে ফলন

কৃষি ডেস্ক

অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ০৭:০২ পিএম

সৌরশক্তিচালিত সেচ ব্যবস্থায় কৃষি বিপ্লব বরেন্দ্রে কমছে ব্যয় বাড়ছে ফলন

সরকারি সমন্বিত উদ্যোগে পরিবেশবান্ধব সৌরশক্তিচালিত আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে উত্তরাঞ্চলের খরাপ্রবণ বরেন্দ্র জনপদে কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। সোমবার (১৯ অক্টোবর) সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, বিকল্প এই শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কৃষকদের উৎপাদন খরচ নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি সার্বিক ফসল উৎপাদন লক্ষণীয় হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে এই উদ্যোগ বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় বিদ্যুৎহীন, তীব্র খরা ও অত্যন্ত দুর্গম চরাঞ্চলে গত দুই বছরে ৩২টি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সোলার সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে প্রান্তিক চাষিদের সেচ বাবদ নিয়মিত ব্যয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে এবং সার্বিক ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।

‍‍`রাজশাহী বিভাগ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প‍‍`-এর অধীনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সর্বোচ্চ ব্যবহার বাড়ানো, সেচ ব্যয় কমানো এবং ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধ করতে বরেন্দ্র অঞ্চলে এই প্রযুক্তি সম্প্রসারণের কাজ চলছে।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যৌথভাবে প্রকল্পটি পরিচালনা করছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, এই চলমান প্রকল্পের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের ৬৭টি উপজেলার তিন হাজার ২০০ জন কৃষক সরাসরি আধুনিক সেচ সুবিধার আওতায় এসেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০২৭ সালের জুন মাসে এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক মেয়াদ শেষ হবে।

প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানি বা আমদানিনির্ভর ডিজেল এবং জাতীয় বিদ্যুৎ সংযোগের ওপর কৃষকদের দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কাটিয়ে একটি আত্মনির্ভরশীল টেকসই কৃষি অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে।

দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের হাতে এই প্রযুক্তি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তুলে দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় সুনির্দিষ্টভাবে তিনটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে সোলার পাম্প নির্মাণ ও স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই অশ্বশক্তির ফিক্সড সোলার ইরিগেশন ক্যাটাগরিতে বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মোট ২৪টি স্থায়ী সোলার ইরিগেশন প্ল্যান্ট চালু করা হয়েছে, যা নির্দিষ্ট জমিতে নিয়মিত ও ঝামেলাহীন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করছে।

দ্বিতীয় ধাপে কৃষকদের তাৎক্ষণিক সুবিধার কথা ভেবে সহজে বহনযোগ্য আটটি পোর্টেবল সোলার ইউনিট বিতরণ করা হয়েছে। এর ফলে চাষিরা ইউনিটগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী এক জমি থেকে অন্য জমিতে বা দূরবর্তী ফলবাগানে সহজে স্থানান্তর করে সেচ দিচ্ছেন।

এ ছাড়া আধুনিক ফলবাগান ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ১০টি প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে।

এই ইউনিটগুলোর প্রতিটি এক একর আয়তনের সুনির্দিষ্ট ফলবাগানের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। জাতীয় বিদ্যুৎ সংযোগহীন কিংবা প্রত্যন্ত দুর্গম এলাকায় ডিজেলের বাড়তি দাম ও সংকটের কোনো ঝুঁকি ছাড়াই এটি কার্যকরভাবে সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে।

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাওয়ায় বিজ্ঞানীরা পানি সাশ্রয়ী বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন।

প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন পদ্ধতিতে সৌরচালিত পাম্পের সঙ্গে অত্যাধুনিক ড্রিপ ইরিগেশন বা ফোঁটায় ফোঁটায় সেচ ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। পাইপলাইনের সাহায্যে সরাসরি প্রতিটি গাছের শিকড়ে পরিমিত পানি পৌঁছে দেওয়ায় পানির অপচয় পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে এবং মাটির স্বাভাবিক আর্দ্রতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। একই সঙ্গে জমিতে অনাকাঙ্ক্ষিত আগাছার উপদ্রব হ্রাস পেয়েছে এবং উৎপাদিত ফলের গুণগত মান আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।

মাঠপর্যায়ে এই প্রযুক্তির সুফল সরাসরি পেতে শুরু করেছেন উপকারভোগী কৃষকেরা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষক মো. আলমগীর হোসেন জানান, আগে ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে বাগানে সেচ দিতে গিয়ে উৎপাদন খরচের বড় অংশই চলে যেত তেলের পেছনে। সেচ মৌসুমে চাহিদামতো ডিজেল না পেয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়তে হতো। এখন সরকারি সৌর সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে অত্যন্ত সহজে পানি দেওয়া যাচ্ছে, যা খরচ ও অপচয় কমিয়ে গাছের পরিচর্যা অনেক স্বস্তিদায়ক করেছে।

প্রযুক্তির মাঠপর্যায়ের কার্যকারিতা নিয়ে ইতিবাচক মূল্যায়ন জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারাও।

রাজশাহীর পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মান্নান জানান, তীব্র খরা ও পানিসংকটপূর্ণ এই এলাকায় আমদানিনির্ভর ডিজেল ও জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমিয়ে কৃষকদের নিজস্ব সক্ষমতা তৈরিতে এই সৌর সেচ ব্যবস্থা অনন্য অবদান রাখছে।

‍‍`রাজশাহী বিভাগ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প‍‍`-এর পরিচালক ও কৃষিবিদ এস এম হাসানুজ্জামান জানান, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিক নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপগুলোর কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছিল। গত দুই বছরে ৩২টি সোলার পাম্প চালুর পর অনাবাদি ও পতিত জমিতেও বছরে তিনটি ধানসহ অতিরিক্ত ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে।

নিয়মিত ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এসব সৌর পাম্প ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে সক্ষম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রকল্প পরিচালক।

পরিবেশবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজেলচালিত পাম্পের বদলে নবায়নযোগ্য সৌরশক্তির এই বহুমুখী ব্যবহার জ্বালানি আমদানির ওপর রাষ্ট্রীয় নির্ভরতা কমাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও বিরূপ আবহাওয়ার চরম ঝুঁকিতে থাকা বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি খাতকে আধুনিক, টেকসই ও লাভজনক করতে এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুরক্ষা জোগাচ্ছে।