রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

পৌনে তিনশ’ বছরের ঐতিহাসিক কান্তজিউ রাস মেলা শুরু, ভক্তদের মিলনমেলা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

নভেম্বর ৫, ২০২৫, ০৯:২৬ পিএম

পৌনে তিনশ’ বছরের ঐতিহাসিক কান্তজিউ রাস মেলা শুরু, ভক্তদের মিলনমেলা

পৌনে তিনশ’ বছর ধরে চলে আসা ঐতিহাসিক শ্রী শ্রী কান্তজিউ মন্দিরকে ঘিরে মাসব্যাপী রাস উৎসব ও মেলা পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে। হাজার হাজার ভক্ত রাধা-কৃষ্ণের লীলা স্মরণে এখানে ভজন, কীর্তন ও পূজায় অংশ নেন। মন্দির প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উচ্ছ্বাসের এক মিলনমেলা।

দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের ঢেপা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক শ্রী শ্রী কান্তজিউ মন্দিরটি। এই মন্দিরকে ঘিরে বুধবার (৫ নভেম্বর) থেকে এক মাসব্যাপী শুরু হয়েছে এই রাস মেলা। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসের পূর্ণিমায় প্রতি বছরের মতো এ বছরও পূর্ণিমা রাত্রি ১২টা ১ মিনিটে রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ রাজবেদিতে পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার সূচনা করা হয়।

মেলায় রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহকে এক নজর দেখা এবং পাপ মোচন করে পুণ্যের আশায় বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো নারী-পুরুষ ও ভক্তবৃন্দের আগমন ঘটেছে মেলা শুরু হওয়ার ২-৩ দিন পূর্ব থেকে। ঐতিহাসিক শ্রী শ্রী কান্তজিউ রাস মেলায় বিশেষ নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিত করতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে কঠোর পদক্ষেপ।

বুধবার বিকাল ৬টার দিকে মন্দির চত্বরে রাস মেলার উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি হিসেবে জেলা প্রশাসক ও দিনাজপুর রাজ দেবোত্তর এস্টেটের সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন দিনাজপুর পুলিশ সুপার মো. মারুফাত হুসাইন। এসময় উপস্থিত ছিলেন দিনাজপুর-১ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু, দিনাজপুর রাজ দেবোত্তর এস্টেটের এজেন্ট রনজিৎ কুমার সিংহ, দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বরূপ বকসী বাচ্চুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ।

মন্দির ও মেলা দেখার জন্য বাংলাদেশসহ ভারত এবং বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও ভক্তবৃন্দের সমাগম ঘটে এই রাস মেলায়। বিকেলের পর থেকে লোক সমাগম বাড়তে থাকে। কান্তজিউ মন্দিরে ভক্ত ও পুণ্যার্থীদের মিলন মেলায় পরিণত হয়।

মেলায় প্রবেশের সাথে শোনা যাবে চারদিকে হই-হুল্লোড়, না হয় ‘দাদা এদিকে আসেন-কি লাগবে ভাই, আসুন’— দোকানিদের আহ্বান। আবার কোনো দোকান থেকে ভেসে আসবে কেনাকাটার দরদামের কথা।

মাসব্যাপী এই উৎসব ও মেলায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ব্যবসায়ীরা তাদের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। দোকানিরা চুড়ি, ফিতা, কানের দুল, গলার চেইন, টি-শার্ট, প্যান্ট, কাগজ ও প্লাস্টিকের ফুল, চশমা, পুতুলসহ হরেক রকমের খেলনা, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেব-দেবীর মূর্তি বা প্রতিমা, পূজার প্রয়োজনীয় শঙ্খ, ঢোল, কাশা, বাঁশি, প্রদীপ, জিলাপি, খুরমা, মন্ডা-মিঠাই ও মিষ্টান্ন বিক্রি করছেন। মন্দিরের পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণে দোকানের সারি দেখা যাবে।

ধর্মীয় কীর্তনগান ছাড়াও হিন্দু ধর্মীয় বইপুস্তক, শাঁখা-সিঁদুর, শঙ্খ, বালা, চুড়িসহ নানান পণ্যের পসরা সমৃদ্ধ দোকান রয়েছে। পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা বেশ উপভোগ করছেন মেলা।

এখানে একেকজন একেক উদ্দেশ্য নিয়ে আসেন। কেউ ভগবানের দর্শনের জন্য আসেন, কেউ পরিবারের মানত ও সন্তানদের মঙ্গল কামনা করে আসেন।

বীরগঞ্জ থেকে আসা সবুজ রায় বলেন, "১৫-১৬ বছর ধরে এই মেলায় আসি। বড় মন্দিরও আছে। কেনাকাটা করা যাচ্ছে। মন্দির দর্শন করলাম। তবে মেলায় আসা জিনিসপত্রের দাম বেশি মনে হচ্ছে।"

ভক্ত প্রশান্ত রায় ও সুকুমার রায় বলেন, "রাসমেলায় এসেছি। ভগবানের প্রসাদও পেয়েছি। বাচ্চাদের পছন্দের জিনিস কিনেছি, গরম গরম জিলাপি কিনেছি, বাসায় গিয়ে সবাই মিলে খাবো।"

এদিকে সব ধরনের নিরাপত্তায় মেলাসহ মন্দিরকে ঘিরে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন কাজ করছেন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রতি বছর রাস পূর্ণিমার তিথিতে রাস উৎসব পালিত হয়। রাজা প্রাণনাথ ১৭০৪ সালে কান্তজিউ মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। পরে তার পোষ্যপুত্র রামনাথ ১৭৫২ সালে কাজ শেষ করেন। ওই বছর থেকেই কান্তজিউ মন্দিরকে ঘিরে রাস উৎসব ও মেলা বসে।