মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার নিম্নমুখী দেশে দাম বৃদ্ধির কারণ

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ০১:০৫ পিএম

জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার নিম্নমুখী দেশে দাম বৃদ্ধির কারণ

ছবি: দিনাজপুর টিভি গ্রাফিক্স

সৌদি আরবে সামরিক সংঘাত বহাল থাকার পরও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিম্নমুখী হয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারের এই নিম্নগতির বিপরীতে উল্টো চিত্র দেখা গেছে বাংলাদেশে। দেশের বাজারে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। আজ সোমবার সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের ভবিষ্যৎ সরবরাহের দাম ৮১ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৩ দশমিক ০৬ ডলারে নেমে আসে।

একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৯ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ কমে ৯৯ দশমিক ৪১ ডলারে স্থির হয়। এর আগে গত শনিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদসহ দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইয়েমেনের হুথিরা। আঘাতের লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাও ছিল। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের দাবি, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হুথিদের ছোড়া সব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সফলভাবে প্রতিহত করেছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এই হামলার পরও সৌদি আরব থেকে বিশ্ববাজারে তেল রপ্তানি অব্যাহতভাবে বাড়ছে।

এর ফলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী কোনো ঘাটতি দেখা দেবে না বলে আন্তর্জাতিক বাজারে একটি আশ্বস্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে অপরিশোধিত জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্যে। বিপরীতভাবে বাংলাদেশে রোববার রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপনে চার ধরনের জ্বালানি তেলের নতুন দর ঘোষণা করা হয়। আজ সোমবার থেকে কার্যকর হওয়া নতুন দর অনুযায়ী ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। পেট্রোলের দাম ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৩৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

মূল্যবৃদ্ধির ব্যাখ্যায় সরকার জানিয়েছে, গত মার্চ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যয় বা ফ্রেইট চার্জ অস্বাভাবিক বেড়েছিল। ওই সময় আন্তর্জাতিক বাজারে দামের তীব্র ঊর্ধ্বগতি সত্ত্বেও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে তা সমন্বয় করা হয়নি। ফলে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ব্যাপক আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির পুঞ্জীভূত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। সরকারের দাবি, এই নতুন মূল্য সমন্বয়ের ফলে বিপিসির লোকসানের ভার কিছুটা লাঘব হবে এবং আমদানির ক্ষেত্রে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর সৃষ্ট বাড়তি চাপ কমে আসবে।

চলতি বছরে এর আগেও গত ১৮ এপ্রিল জ্বালানির দামে বড় ধরনের সমন্বয় এনেছিল সরকার। তখন ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১ জুন থেকে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারে আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হলেও সে সময় ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। ফলে সেপ্টেম্বরের এই সর্বশেষ বৃদ্ধির আগপর্যন্ত ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।

কেবল পরিবহন ও কৃষির জ্বালানিই নয়, চলতি বছর উড়োজাহাজের জ্বালানি জেট ফুয়েল ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দামও কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে। গত ৭ এপ্রিল দেশীয় ফ্লাইটের জন্য জেট ফুয়েলের দাম লিটারপ্রতি ২২৭ টাকা আট পয়সা এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য এক দশমিক ৪৮০৬ ডলার নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এর পরপরই ১২ এপ্রিল বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দাম লিটারপ্রতি ৭০ টাকা ১০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯৪ টাকা ৬৯ পয়সা করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য এবং মার্কিন ডলারের বিনিময় হারের ব্যাপক পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই এই দর সমন্বয় করা হয়েছিল বলে বিইআরসি জানিয়েছিল।

জ্বালানি তেলের এই আর্থিক চাপের বিষয়ে এর আগে জাতীয় সংসদে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছিলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি জানিয়েছিলেন, ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে বিশ্ববাজারে ডিজেলের গড় দাম ৯৮ শতাংশ এবং অকটেনের দাম ২৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। এই ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সরকারকে নিজস্ব কোষাগার থেকে বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি গুনতে হয়েছে। সে সময় মার্চ থেকে জুন প্রান্তিকে শুধু ডিজেল খাতেই ১৫ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা এবং অকটেনে ৬৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি ব্যয়ের হিসাব সংসদে তুলে ধরেছিলেন জ্বালানিমন্ত্রী।

বিপিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর জ্বালানি তেলের মোট জাতীয় চাহিদা প্রায় ৭৫ লাখ টন। এই বিপুল চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশই এককভাবে ডিজেল। অবশিষ্ট চাহিদা মেটানো হয় পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, উড়োজাহাজের জেট ফুয়েল এবং ভারী শিল্পের ফার্নেস অয়েল দিয়ে। বাংলাদেশে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে দুই ধরনের পৃথক প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃপক্ষ কাজ করে। বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ভারী শিল্পের ফার্নেস অয়েল এবং বিমানের জেট ফুয়েলের দর সমন্বয় করে স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। অন্যদিকে গণপরিবহন, কৃষি ও ব্যক্তিপর্যায়ে ব্যবহৃত ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের মূল্য সরাসরি নির্ধারণ করে থাকে মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ।

অভ্যন্তরীণ বাজারে দর বাড়ানোর পেছনে সরকারের আরেকটি প্রধান যুক্তি হলো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তেলের মূল্যের ভারসাম্য রক্ষা করা। জ্বালানি বিভাগের মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দামের ব্যবধান অনেক বেশি থাকলে সীমান্তপথে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে তেল পাচারের প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়। দাম কিছুটা বাড়িয়ে এই মূল্যের ফারাক কমিয়ে আনলে সীমান্তপথে জ্বালানি পাচার বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করে সরকার। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, তেলের মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত কেবল পাম্পে গিয়ে বাড়তি টাকা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

বিশেষ করে উৎপাদন ও পরিবহনের প্রধান জ্বালানি ডিজেলের দাম বাড়লে গণপরিবহন ভাড়া, পণ্যবাহী যানের ভাড়া, কৃষি সেচ ও ভারী কারখানার উৎপাদন খরচ সরাসরি বেড়ে যায়। অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বিশ্লেষণ করেছেন, জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে প্রথমেই পরিবহন ব্যয় বাড়বে, যা চাল, ডাল, শাকসবজিসহ সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজারে তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সাথে কৃষিতে সেচ ও যান্ত্রিক চাষাবাদের খরচ বাড়বে এবং শিল্পকারখানায় সার্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় ঊর্ধ্বমুখী হবে।

এর ফলে একজন সাধারণ ভোক্তা নিজে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করলেও অথবা সরাসরি জ্বালানি তেল ক্রয় না করলেও, পণ্য পরিবহন ও বাজারমূল্যের সামগ্রিক ঊর্ধ্বগতির কারণে পরোক্ষভাবে তাকেই সেই বাড়তি খরচের বোঝা বইতে হবে। অতীতে দেশে এক দফায় সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল ২০২২ সালের আগস্টে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরুর পর সে সময় অভ্যন্তরীণ বাজারে এক লাফে ডিজেলের দাম ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১১৪ টাকা করা হয়েছিল।

এবারের আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির পর আন্তর্জাতিক তেলের গতিবিধির ওপর সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বৈশ্বিক সরবরাহকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে, অন্যদিকে সৌদি আরবের স্থিতিশীল তেল রপ্তানির কারণে বিশ্ববাজারে দাম নিম্নমুখী হচ্ছে। এই দুই পরস্পরবিরোধী প্রবণতার মধ্যে অভ্যন্তরীণ বাজারে নতুন মূল্যের নেতিবাচক চাপ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে কতটা ভোগায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।