অক্টোবর ১২, ২০২৬, ০৯:৩৪ এএম
দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই প্রবাহে টান পড়লেও সার্বিক বৈদেশিক ঋণের বোঝা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে দেশে আসা নিট বিদেশি বিনিয়োগ আগের তিন মাসের তুলনায় ২২ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে একই সময়ে দেশের সার্বিক বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়েছে। গত জুন শেষে সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশে নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ মার্কিন ডলার। এর আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে এর পরিমাণ ছিল ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই প্রবাহ ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেশি। গত বছরের এপ্রিল-জুনে নিট বিনিয়োগ এসেছিল ৩০ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। সব মিলিয়ে গত জুন শেষে দেশে মোট বিদেশি বিনিয়োগের পুঞ্জীভূত স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলারে।
মূলধনী বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও স্থবিরতা লক্ষ্য করা গেছে। এপ্রিল-জুন সময়ে নতুন মূলধনী বা ইকুইটি বিনিয়োগ এসেছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ডলার, যা আগের প্রান্তিকের চেয়ে ১ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ কম। এ প্রান্তিকে পুনর্বিনিয়োগ থেকে এসেছে ২৬ কোটি ডলার। এটি আগের প্রান্তিকের চেয়ে ২৩ দশমিক ৯২ শতাংশ কম হলেও গত বছরের একই প্রান্তিকের চেয়ে ৫৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে আন্তঃকোম্পানি ঋণের মাধ্যমে আসা বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি কমেছে। আগের প্রান্তিকের তুলনায় এ খাতে বিনিয়োগ ৬৭ শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আর্থিক খাত সংস্কার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন রোধ ও ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরলেও বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত গতি ফেরেনি। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাংকঋণের চড়া সুদহার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তার কারণে নতুন উদ্যোক্তারা কারখানা স্থাপনে দ্বিধায় ভুগছেন।
বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী জানান, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন পুঁজি বিনিয়োগ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাজারে পণ্যের চাহিদা কম এবং রপ্তানি এখনো মূলত তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বজুড়ে শুল্ক বিরোধ ও বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। চীন থেকে বিনিয়োগ স্থানান্তরের সুযোগ থাকলেও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট ও অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপে বিদ্যমান কারখানার উৎপাদনই ব্যাহত হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত না হলে নতুন পুঁজি টানা সম্ভব নয়।
দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
তিনি উল্লেখ করেন, শুধু রাজনৈতিক রূপান্তর বা সরকার থাকাই বিনিয়োগের জন্য যথেষ্ট নয়, বিনিয়োগের কাঠামোগত বাধাগুলো আগে দূর করা দরকার। হঠাৎ প্রজ্ঞাপন জারি করে নীতি বদল করলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হয়। দেশের ভেতরের উদ্যোক্তারা সক্রিয় না হলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ভরসা পাবে না। তিনি ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা, বিনিয়োগ প্রত্যাহারের পথ মসৃণ রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতির ওপর গুরুত্ব দেন। এমনকি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ জটিলতা ও ট্রলি সংকট বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শুরুতেই নেতিবাচক ধারণা দেয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
এদিকে বিদেশি বিনিয়োগ কমলেও বৈদেশিক ঋণের চাপ দ্রুত বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ১১০ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার, যা জুন শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৪ দশমিক শূন্য ৫ বিলিয়ন ডলার।
এই ঋণের বড় অংশই যুক্ত হয়েছে সরকারের কাঁধে। সরকারি খাতের বিদেশি ঋণ মার্চ মাসের ৯০ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে জুন শেষে ৯৫ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তিন মাসে সরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার।
বিপরীত চিত্র দেখা গেছে বেসরকারি খাতে। মার্চ শেষে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ২০ বিলিয়ন ডলার, যা জুন শেষে কমে ১৯ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া সুদহার, টাকার অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকির কারণে দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত ঋণ পরিশোধ করে নতুন দায় নেওয়া কমিয়ে দিচ্ছে।
সরকারি ঋণ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, প্রতিবছর বাজেট ঘাটতি মেটাতে গিয়ে সরকারকে বিদেশ থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। এই পরনির্ভরতা কাটাতে হলে রাষ্ট্রের আর্থিক অপচয় বন্ধ করা, কৃচ্ছ্রসাধন নিশ্চিত করা এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন