সোমবার, ০৫ অক্টোবর, ২০২৬,

পরীক্ষার আগেই কি কুকুর ক্যানসার শনাক্ত করতে পারে? গবেষণায় নতুন তথ্য

স্বাস্থ্য ডেস্ক

অক্টোবর ৫, ২০২৬, ১১:৫১ এএম

পরীক্ষার আগেই কি কুকুর ক্যানসার শনাক্ত করতে পারে? গবেষণায় নতুন তথ্য

ল্যাবরেটরির জটিল রক্ত পরীক্ষা বা ব্যয়বহুল স্ক্যান করানোর আগেই মানুষের নিঃশ্বাসের ঘ্রাণ শুঁকে ক্যানসার শনাক্ত করার এক অভাবনীয় পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন গবেষকরা। কুকুরের তীক্ষ্ণ ঘ্রাণশক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিগত সমন্বয় ঘটিয়ে এই যুগান্তকারী ও অ-আক্রমণাত্মক স্ক্রিনিং ব্যবস্থা তৈরি করেছে বায়োটেক স্টার্টআপ ডগনোসিস। ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের বেঙ্গালুরু উপকণ্ঠের কেম্পোহাল্লি গ্রামে পরিচালিত এই গবেষণায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। ঘ্রাণশক্তি ও প্রযুক্তির এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটেছে এই ল্যাবে।

বিজ্ঞানীদের মতে মানবদেহে রোগ বাসা বাঁধলে অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণে নিঃশ্বাসের বাতাসে নির্দিষ্ট গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের নাকের ভেতরে যেখানে প্রায় ৫০ লাখ সেন্ট রিসেপ্টর থাকে, সেখানে কুকুরের নাকে রয়েছে প্রায় ৩০ কোটি রিসেপ্টর। এই প্রাকৃতিক দক্ষতাকে কাজে লাগাতে ল্যাবের কুকুরগুলোকে পরানো হয় সেন্সরযুক্ত বিশেষ পোশাক ও থ্রিডি-প্রিন্টেড হেলমেট, যাকে গবেষকরা ভালোবেসে ডগি আয়রন ম্যান স্যুট বলে ডাকেন।

পরীক্ষা পদ্ধতিটি অত্যন্ত সহজ ও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত। রোগীকে একটি সুতি মাস্কে প্রায় ১০ মিনিট স্বাভাবিক শ্বাস নিতে হয়। পরে সেই মাস্কটি বিশেষ ব্যাগে ভরে গবেষণাগারে পাঠানো হয়। এতে রোগী ও কুকুরের মধ্যে কোনো সরাসরি শারীরিক সংস্পর্শ ঘটে না। ল্যাবে রাখা নমুনা শুঁকেই কুকুর নিমেষেই রোগের উপস্থিতি শনাক্ত করে ফেলে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় বার্কলে থেকে কগনিটিভ সায়েন্সে পড়াশোনা করা ২৬ বছর বয়সী আকাশ কুলগোদ এবং ইসরায়েলি স্পেশাল ফোর্সের ক্যানাইন ইউনিটের সাবেক সদস্য ২৮ বছর বয়সী ইতামার বিতানের যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ডগনোসিস। তারা কেবল কুকুরের বাহ্যিক শারীরিক প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছেন না। কুকুরের মস্তিষ্কের তরঙ্গ, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি ও অঙ্গভঙ্গি সেন্সরে ধরা পড়ার পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তা নিখুঁত ডেটায় রূপান্তর করে। প্রশিক্ষিত প্রতিটি কুকুর ঘণ্টায় হাজার হাজার নমুনার ঘ্রাণ পরীক্ষা করতে পারে।

কর্ণাটকের ছয়টি হাসপাতালের দেড় হাজারের বেশি মানুষের ওপর পরিচালিত এই গবেষণা আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজির চিকিৎসা সাময়িকী জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজিতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাপত্র অনুযায়ী সাতটি প্রধান ধরনের ক্যানসার শনাক্তের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির নির্ভুলতার হার ৯০ শতাংশের বেশি।

চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে এই উদ্ভাবন নিয়ে সতর্ক কিন্তু ইতিবাচক পর্যবেক্ষণ এসেছে। বেঙ্গালুরুর রামাইয়া মেমোরিয়াল হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান ডা. সন্তোষ কুমার দেবদাস এই গবেষণাকে প্রাথমিক হলেও অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক সংকেত হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে মনিপাল হাসপাতালের অনকোলজিস্ট ডা. নীলেশ রেড্ডি সাধারণ মানুষের চিকিৎসার নিয়মিত ব্যবহারে আনার আগে আরও বিস্তৃত পরিসরে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করার ওপর তাগিদ দিয়েছেন।

গবেষণাগারে ক্লোই নামের একটি ল্যাব্রাডর মিক্সসহ বিগল, ম্যালিনয়েস ও শেফার্ড জাতের প্রায় ১৫টি কুকুরকে স্নিফস্পেস সেন্টারে ইতিবাচক অনুশাসনের মাধ্যমে বিশেষ ঘ্রাণ চেনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কাজের পাশাপাশি তাদের সার্বিক আনন্দ ও বিশ্রামের পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। কুকুরগুলোকে দিনে মাত্র ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট কাজ করতে হয় এবং প্রতিটি সঠিক শনাক্তকরণের পরপরই স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র থেকে তাদের জন্য সুস্বাদু পুরস্কার বেরিয়ে আসে।

ভারতে প্রতি ৯ জনের মধ্যে ১ জন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন এবং রোগ দেরিতে ধরা পড়াই চিকিৎসার প্রধান সংকট। এই বায়োটেক উদ্যোগটি প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক অনুমোদন পেলে জার্মানি ও ইসরায়েলের পর বিশ্বজুড়ে এটি হবে এ ধরনের তৃতীয় প্রতিষ্ঠান।