অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ১০:৩৪ পিএম
ঘুমের মধ্যে লালা ঝরে বালিশ ভিজে যাওয়া অনেকের জীবনেই বেশ পরিচিত একটি অভিজ্ঞতা। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, অতিরিক্ত ক্লান্তি, একপাশে ফিরে শোয়ার অভ্যাস কিংবা সাধারণ সর্দি ও অ্যালার্জির কারণে মাঝেমধ্যে এমনটি ঘটতে পারে। তবে এটি যদি প্রায় প্রতি রাতের নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়, তবে বিষয়টি মোটেও হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। কারণ অনবরত লালা নিঃসরণ স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো জটিল শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বা পারকিনসনস রোগের মতো স্নায়ুর অবক্ষয়ের প্রাথমিক উপসর্গ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএনের এক সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সাময়িক কারণে মুখ থেকে লালা পড়া স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া।
বিশেষ করে রাতে অতিরিক্ত মদ্যপান কিংবা ভরপেট গুরুপাক খাওয়ার পর সোফায় বা অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে ঘুমিয়ে পড়লে এমন হতে পারে। কিন্তু কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে যদি সমস্যাটি হঠাৎ করেই দেখা দেয় এবং প্রায় প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ভেজা বালিশ দেখতে হয়, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
চিকিৎসকদের পর্যালোচনার ভিত্তিতে ঘুমের সময় মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা ঝরার প্রধান ছয়টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রথমত, স্লিপ অ্যাপনিয়ার ঝুঁকি। ঘুমের ঘোরে যখন স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস বারবার বাধাগ্রস্ত বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তখন তাকে স্লিপ অ্যাপনিয়া বলা হয়। এই অবস্থায় শরীরের অক্সিজেন ঘাটতি পূরণে অবচেতনভাবেই ব্যক্তি মুখ দিয়ে বাতাস নেওয়া শুরু করে, যার ফলে জমে থাকা লালা বাইরে বেরিয়ে আসে। রাতে বিকট শব্দে নাক ডাকা, সকালে মুখ শুকিয়ে থাকা কিংবা সারাদিন ঘুম ভাব থাকলে এটি স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ হতে পারে। যথাযথ চিকিৎসা না করালে এটি মারাত্মক হৃদ্রোগ, স্ট্রোক এবং অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দেয়।
দ্বিতীয়ত, মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার প্রবণতা। নাকের ভেতরের মধ্যবর্তী হাড় বাঁকা থাকা, শ্বাসনালির পথ সরু হয়ে যাওয়া কিংবা অ্যাডিনয়েড গ্রন্থির অস্বাভাবিক স্ফীতির কারণে ফুসফুসে পর্যাপ্ত বাতাস ঢুকতে পারে না। বাধ্য হয়ে মুখ হা করে ঘুমাতে হয়, যা লালা পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। এমন জটিলতায় নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, খাদ্যনালির অ্যাসিড রিফ্লাক্স। পাকস্থলীর অ্যাসিড ও খাদ্য উপাদান বিপরীতমুখী চাপে গলার দিকে উঠে এলে মুখে টক স্বাদ, তীব্র বুকজ্বালা কিংবা অস্বস্তি দেখা দেয়। এই অ্যাসিডের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে মানবদেহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে অতিরিক্ত লালা উৎপাদন করে। ফলে রাতে দীর্ঘস্থায়ী কাশি কিংবা সকালে গলায় ঘন শ্লেষ্মা জমে থাকার সমস্যা তৈরি হয়।
চতুর্থত, সর্দি, মৌসুমী অ্যালার্জি ও সংক্রমণ। সাধারণ ফ্লু, অ্যালার্জিজনিত রাইনাইটিস, সাইনাসের সংক্রমণ কিংবা টনসিলের তীব্র প্রদাহে নাকের পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া ছাড়া পথ না থাকায় লালার নির্গমন ঘটে। মুখের ভেতরের অভ্যন্তরীণ ব্যাকটিরিয়া বা ছত্রাকের সংক্রমণও এই নিঃসরণ বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
পঞ্চমত, দাঁত ও চোয়ালের ত্রুটিপূর্ণ গঠন। ঘুমের ঘোরে দাঁত কিড়মিড় করার অভ্যাস থাকলে কিংবা ওপর-নিচের পাটির দাঁত সঠিকভাবে না বসলে ঠোঁট দুটি স্বাভাবিকভাবে বন্ধ রাখা সম্ভব হয় না। এমন শারীরিক অসঙ্গতি দেখা দিলে দ্রুত দন্তচিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।
ষষ্ঠত, শোয়ার শারীরিক ভঙ্গি বা পজিশন। যারা নিয়মিত কাত হয়ে কিংবা পেটের ওপর ভর দিয়ে উপুড় হয়ে ঘুমান, তাদের মুখ থেকে লালা বালিশে গড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। অভিকর্ষজ বলের কারণে মুখে জমা লালা সরাসরি বাইরে চলে আসে। অন্যদিকে চিৎ হয়ে ঘুমালে লালা মুখের ভেতরে জমে থাকে বা গলার দিকে নেমে যায়। তবে যাদের ঢোক গিলতে অসুবিধা রয়েছে, তাদের জন্য চিৎ হয়ে শোয়াও বাড়তি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, কিছু নির্দিষ্ট বিপজ্জনক উপসর্গের সাথে লালা পড়ার সংযোগ থাকলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
এর মধ্যে রয়েছে প্রায় প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে বালিশ ভেজা পাওয়া, রাতে শ্বাসরোধের অনুভূতি বা তীব্র নাক ডাকা, সকালে ঘুম ভাঙার পর তীব্র মাথাব্যথা বা মুখ শুকিয়ে থাকা, দিনের বেলায় অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও তন্দ্রাচ্ছন্নতা এবং খাদ্য বা পানীয় গিলতে কষ্ট হওয়া। এছাড়া রোগীর হাঁটার স্বাভাবিক গতি বা ধরনে আকস্মিক পরিবর্তন এলে এবং মুখের অভিব্যক্তি ভাবলেশহীন হয়ে পড়লে তা পারকিনসনস রোগসহ জটিল স্নায়ুর অবক্ষয়ের পূর্বাভাস হতে পারে। তবে শুধুমাত্র লালা পড়লেই আতঙ্কে এমন কোনো স্নায়বিক রোগ ধরে নেওয়া অনুচিত।
সামাজিক মাধ্যমে লালা পড়া আটকাতে মুখে আঠালো টেপ লাগিয়ে ঘুমানোর যে পরামর্শ প্রচার করা হয়, তাকে পুরোপুরি বিপজ্জনক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন চিকিৎসকরা। এর পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং নাক বন্ধ থাকা বা গ্যাস্ট্রিকের অ্যাসিড উঠে আসার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তির মুখ কৃত্রিমভাবে আটকে রাখলে তা প্রাণঘাতী দমবন্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, নিজে থেকে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ না নিয়ে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ বা স্লিপ মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে বাড়িতেই রোগীর আধুনিক স্লিপ টেস্ট করিয়ে সঠিক কারণ শনাক্ত করে কার্যকর চিকিৎসা নেওয়াই নিরাপদ পথ বলে জানিয়েছে দিনাজপুর টিভি ডট কম।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন