রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬,

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মেধার বিকাশ ও ঝুঁকি: গবেষণায় বিস্ময়কর তথ্য

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক

অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ১১:২৯ এএম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মেধার বিকাশ ও ঝুঁকি: গবেষণায় বিস্ময়কর তথ্য

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত বদলে দিচ্ছে মানুষের জীবনযাপন, জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি এবং মৌলিক চিন্তাভাবনার গতিপ্রকৃতি। প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি যেমন নতুন সম্ভাবনার বিস্তার ঘটাচ্ছে, তেমনি নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও সহজাত দক্ষতার ওপর মানবজাতির নির্ভরতা কমে যাওয়ার বড় ঝুঁকিও তৈরি করছে। প্রযুক্তি নীতিবিদ ও দার্শনিক হেনরি শেভলিনের এক সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় বিষয়টি বিশদভাবে উঠে এসেছে।

পাঁচ বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে এই প্রযুক্তি অভাবনীয় পরিবর্তন এনেছে। অতীতে সাধারণ দুই অঙ্কের সংখ্যার গুণ করতে হিমশিম খাওয়া ব্যবস্থা এখন জটিল গাণিতিক গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। একসময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি ছবিতে মানুষের হাতের আঙুলের সংখ্যায় ত্রুটি দেখা যেত, অথচ এখন বাস্তবসম্মত ভিডিও ও মানুষের অবিকল প্রতিরূপ তৈরি হচ্ছে যা আসল থেকে আলাদা করা কঠিন।

শেখার ক্ষেত্রে এর সুফল ও নেতিবাচক প্রভাব উভয়ই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ার বেনিন সিটিতে পরিচালিত একটি সরেজমিন সমীক্ষায় দেখা গেছে, শ্রেণিকক্ষের বাইরে স্বয়ংক্রিয় বুদ্ধিমান প্রযুক্তির সমন্বয়ে ছয় সপ্তাহ পাঠদানের পর শিক্ষার্থীদের যে শিখন অগ্রগতি হয়েছে, তা বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে প্রচলিত ব্যবস্থার প্রায় দুই বছরের সমান। তবে এই পদ্ধতির অপব্যবহার উল্টো ফলও ডেকে আনছে।

তুরস্কের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, সাধারণ জেনারেটিভ সফটওয়্যার ব্যবহার করে অনুশীলন করায় শিক্ষার্থীদের সাময়িক নম্বর প্রায় ৪৮ শতাংশ বেড়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কোনো প্রযুক্তির সহায়তা ছাড়া পরীক্ষা দিতে গিয়ে তারা পাঠ্যবই পড়ে শেখা শিক্ষার্থীদের চেয়ে ১৭ শতাংশ কম নম্বর পায়। গবেষকরা দেখতে পান, সরাসরি প্রস্তুত সমাধান পেয়ে যাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ব্যাহত হয়েছে। তবে যেসব ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ইঙ্গিত দিয়ে সমাধান খুঁজতে উৎসাহিত করা হয়েছিল, সেখানে মেধার ঘাটতি দেখা যায়নি।

সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেও একই সংকট তৈরি হচ্ছে।

মোট ২৯৩ জন লেখকের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রযুক্তির দেওয়া ধারণার সহায়তায় যারা গল্প লিখেছেন তাদের তাৎক্ষণিক সৃষ্টিশীলতা প্রশংসিত হলেও গল্পগুলোর মূল কাঠামোর মধ্যে গভীর সাদৃশ্য তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি ব্যক্তিগত মান বাড়াতে ভূমিকা রাখলেও সার্বিক সৃষ্টিশীল কাজের স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্র্য কমিয়ে দিচ্ছে।

চিন্তাশক্তির ওপর প্রযুক্তির প্রভাবের এই বিতর্ক অবশ্য মানব সভ্যতায় নতুন নয়। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর সংলাপে দেখা যায়, লেখার প্রচলনের কারণে মানুষের স্বাভাবিক স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাবে বলে সতর্ক করেছিলেন সক্রেটিস। পরবর্তীকালে বিশ শতকের ত্রিশের দশকে মার্কিন গবেষক মিলম্যান প্যারি বলকান অঞ্চলে নিরক্ষর কবিদের ওপর অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেন, তারা কোনো লিপি ছাড়াই স্মৃতি থেকে হাজার হাজার পঙ্‌ক্তির দীর্ঘ মহাকাব্য নিখুঁতভাবে আবৃত্তি করতে পারতেন।

মানব ইতিহাসের বিবর্তনে প্রযুক্তি মানুষের রূপান্তর ঘটিয়েছে বহুবার। আগুনের নিয়ন্ত্রণ ও রান্নার অভ্যাসের ফলে খাবার হজম সহজ হওয়ায় মানুষের চোয়াল ও পরিপাকতন্ত্রে পরিবর্তন এসেছে। কৃষিকাজের বিস্তারের ফলে বুনো খাদ্য চেনার গভীর জ্ঞান অপ্রয়োজনীয় হয়ে হারিয়ে গেছে। এমনকি মস্তিষ্কের স্নায়ুবিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে পড়ার অভ্যাস মানুষের দৃশ্য প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে নতুন পরিবর্তন এনেছে।

দার্শনিক অ্যান্ডি ক্লার্কের মতবাদ অনুযায়ী, মানুষ স্বভাবগতভাবেই বাইরের বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজের শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্যকে সম্প্রসারণ করে থাকে। যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা মানুষের জন্য শেষ পর্যন্ত কী ফল বয়ে আনবে তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, তবে প্রযুক্তির নকশা ও ব্যবহারের কৌশলের ওপরই নির্ভর করবে মানবজাতির ভবিষ্যৎ।