এপ্রিল ১০, ২০২৬, ১১:১০ এএম
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে ঘোষিত ১৫ দিনের যুদ্ধবিরতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে ভারত। তবে এই পুরো শান্তি প্রক্রিয়ায় প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের সরাসরি মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা নিয়ে দিল্লির রহস্যজনক নীরবতা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আশাবাদ ব্যক্ত করা হলেও ইসলামাবাদের কূটনৈতিক সাফল্য নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করা হয়নি। আর এ নিয়েই দেশটির বিরোধী দলগুলো নরেন্দ্র মোদি সরকারের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি ও কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে কড়া সমালোচনা শুরু করেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আমরা যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই এবং আশা করি এটি মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। সংলাপ ও কূটনৈতিক পদক্ষেপই এই যুদ্ধ অবসানের একমাত্র পথ।
ভারত বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার ওপর জোর দিয়েছে, কারণ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এই যুদ্ধের কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অনেক প্রভাবশালী নেতা যখন পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার প্রশংসা করছেন, তখন ভারতের এই নীরবতাকে ‘কূটনৈতিক অস্বস্তি’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ভারতের এই অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস নেতা রশিদ আলভি। তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পররাষ্ট্রনীতির দিকে আঙুল তুলে বলেন, পাকিস্তান যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তা ভারতেরই করা উচিত ছিল। ইতিপূর্বে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছিলেন যে ভারত কোনো ‘ব্রোকার নেশন’ বা মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র হতে আগ্রহী নয়। জয়শঙ্করের সেই মন্তব্য টেনে আলভি প্রশ্ন তোলেন, পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার যে দাবি মোদি সরকার করে আসছিল, বর্তমানে কি তবে ভারতই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে?
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা মেনন রাও মনে করেন, পাকিস্তান সরাসরি মধ্যস্থতাকারী না হলেও এই সংকটে একটি কার্যকর ‘অনুঘটক’ (Catalyst) হিসেবে কাজ করেছে। তার মতে, বর্তমানে সংঘাত কেবল একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে যেখানে আলোচনা ও সামরিক চাপ—উভয়ই সমান্তরালভাবে চলছে। অন্যদিকে, ‘পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট’ বিশ্লেষক অশোক সোয়াইন এই পরিস্থিতিকে পাকিস্তানের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক অর্জন এবং ভারতের জন্য ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন। বিশ্লেষক অভিনব সিংয়ের মতে, পাকিস্তান বর্তমানে এমন এক অনন্য অবস্থানে পৌঁছেছে যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং উপসাগরীয় সব দেশেরই সুসম্পর্ক রয়েছে।
কূটনৈতিক এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ভারতের জন্য একটি বড় ইতিবাচক খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তারা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল হওয়ায় দীর্ঘ সাত বছর পর প্রথমবারের মতো ইরানের জ্বালানি তেল ভারতে আসতে শুরু করেছে। ভারতের অর্থনীতি ও তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেটিজেনদের একাংশ ও বিশ্লেষকরা রসিকতা করে বলছেন, মোদিজির ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার স্বপ্ন ছাপিয়ে পাকিস্তানই এখন শান্তি আলোচনার মধ্যমণি হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালির উত্তপ্ত ঢেউ এখন ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনেও আছড়ে পড়ছে। ইসলামাবাদে আজ শুক্রবার অনুষ্ঠেয় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বৈঠক শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই বৈরী প্রতিবেশীর কূটনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন