বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬,

চুক্তি না হলে যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ০৫:০৭ পিএম

চুক্তি না হলে যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সাত সপ্তাহের তীব্র উত্তজনা ও সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে ইরান ইস্যুতে ইতিবাচক পরিবর্তনের দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু হলেও তিনি এক কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একটি কার্যকর শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে এই অঞ্চলে আবারও যুদ্ধ শুরু হতে পারে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

শনিবার মেরিন ট্রাফিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লারাক দ্বীপের দক্ষিণ পাশ দিয়ে ইরানি জলসীমা অতিক্রম করে একটি বিশাল জাহাজের বহর হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়েছে। এই বহরে চারটি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসবাহী জাহাজসহ বেশ কয়েকটি তেল ও রাসায়নিক ট্যাংকার ছিল। 

সাত সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের ওপর সামরিক হামলা শুরু করে, তারপর থেকে এটিই ছিল এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে প্রথম বড় ধরনের বাণিজ্যিক চলাচল। মূলত ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় বৃহস্পতিবার একটি পৃথক যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে এই স্বস্তির খবরের মধ্যেই নিজের অনড় অবস্থান জানান দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ইরান ইস্যুতে কিছু বেশ ভালো খবর রয়েছে, যা নিয়ে আগামী সপ্তাহান্তেই বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। ফিনিক্স থেকে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প উল্লেখ করেন যে, বুধবারের মধ্যে যদি কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তি না হয়, তবে বর্তমান যুদ্ধবিরতি বাতিল করে আবার সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তার মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরান যেন কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র হাতে না পায়।

ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানের নেপথ্যে তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রে হু হু করে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, রেকর্ড মুদ্রাস্ফীতি এবং জনমত জরিপে জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় প্রেসিডেন্ট এখন দ্রুত একটি সমাধান খুঁজছেন। বিশেষ করে আসন্ন কংগ্রেস নির্বাচনকে সামনে রেখে রিপাবলিকান পার্টির ওপর থাকা চাপ কমাতে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে একটি স্থায়ী বিজয় দেখাতে মরিয়া তিনি। ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, সপ্তাহান্তে ইরানের সাথে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হতে পারে, যদিও এই আলোচনার স্থান বা পদ্ধতি নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে।

কূটনৈতিক মহলে গুঞ্জন ছিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এই আলোচনার আয়োজন হতে পারে। তবে শনিবার সকাল পর্যন্ত সেখানে বিশেষ কোনো প্রস্তুতির লক্ষণ দেখা যায়নি। গত সপ্তাহে ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের সরাসরি বৈঠকটি কোনো ফল ছাড়াই শেষ হয়েছিল। এদিকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তেহরানে তিন দিনের সফর শেষে ফিরেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ কাতার ও তুরস্ক সফর শেষে দেশে ফিরছেন। 

একটি বিশ্বস্ত সূত্র দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বর্তমানে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের চেষ্টা চলছে, যা সফল হলে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তি হতে পারে।অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এ নিয়ে ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের ক্বালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় খোলা রাখা সম্ভব হবে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে ১০ দিনের একটি পরীক্ষামূলক সময়কালে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে পারবে। 

তবে জাহাজগুলোকে অবশ্যই ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সাথে সমন্বয় করে চলতে হবে। এ ছাড়া ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, শত্রুভাবাপন্ন কোনো সামরিক জাহাজ এই প্রণালিতে প্রবেশ করতে পারবে না।বর্তমান আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের মজুদ করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পুরোপুরি সরিয়ে নিতে, যা তেহরান প্রত্যাখ্যান করেছে। 

গত সপ্তাহের আলোচনায় ওয়াশিংটন ২০ বছরের জন্য পারমাণবিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধের প্রস্তাব দিলেও ইরান তা ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য স্থগিত রাখতে চায়। ট্রাম্প এই বিষয়ে বিদ্রূপ করে বলেছেন যে, বড় যন্ত্র দিয়ে খনন করে ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হবে। তবে ধর্মীয় নেতা আহমদ খাতামি শুক্রবারের খুতবায় স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো ধরনের অপমানজনক শর্ত মেনে ইরান আলোচনায় যাবে না। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে শান্ত মনে হলেও যুদ্ধের মেঘ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।