বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬,

পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার মোদির কৌশল যেভাবে ব্যর্থ হলো

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

মে ২৯, ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম

পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার মোদির কৌশল যেভাবে ব্যর্থ হলো

ছবি - সংগৃহীত

পাকিস্তানের নেতাদের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে এক দশক আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছিলেন বিশ্বজুড়ে দেশটিকে একঘরে করা হবে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কেরালার এক জনসভায় দেওয়া সেই বক্তব্যের মূল ভিত্তি ছিল কাশ্মীরে এক হামলায় ১৮ জন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার ঘটনা। তবে দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পর বর্তমান বৈশ্বিক সমীকরণ বলছে মোদির কৌশল বড় আকারের ব্যর্থতায় রূপ নিয়েছে।পাকিস্তান মোটেই বিচ্ছিন্ন নয়।

বর্তমানে দেশটি চীনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে যেখানে চলতি সপ্তাহেই সফর করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে ওয়াশিংটনের এক বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে নতুন করে আত্মপ্রকাশ করেছে দেশটি। বিগত এক বছরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনির উভয়েই হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সাথে আনুষ্ঠানিক বৈঠক সম্পন্ন করেছেন। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখছে ইসলামাবাদ।

গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলোকে কাজে লাগিয়ে পরাশক্তি ও আঞ্চলিক পক্ষগুলোর কাছে নিজেকে একটি অপরিহার্য কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে পাকিস্তান। বিশ্লেষকদের মতে এই পরিবর্তন আংশিকভাবে ট্রাম্প প্রশাসনকে সন্তুষ্ট করার ক্ষেত্রে ইসলামাবাদের নিজস্ব সাফল্য এবং ভারতের কিছু সুনির্দিষ্ট ভুল পদক্ষেপের ফল। আটলান্টিক কাউন্সিল থিঙ্ক ট্যাঙ্কের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে আঞ্চলিক ও বিশ্বব্যাপী পাকিস্তানকে দুর্বল করার ভারতের একমুখী কৌশলটি লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

সবচেয়ে বড় মোড় আসে গত বছর।

২০২৫ সালের ১০ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা করেন যে দীর্ঘ আলোচনার পর তিনি পারমাণবিক অস্ত্রধারী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করেছেন। এর পরপরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চার দিন ধরে চলা তীব্র সামরিক লড়াইয়ের অবসান ঘটানোর জন্য মার্কিন নেতৃত্বকে ধন্যবাদ জানান।

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান এবং ড্রোন ব্যবহার করে চালানো এই লড়াই ছিল সাম্প্রতিক কয়েক দশকের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত। হামলার পেছনে পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ ভূমিকার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে নতুন দিল্লি ব্যর্থ হওয়াকে এর প্রধান কারণ মনে করা হয়।

বিশ্বের প্রধান রাজধানীগুলো লক্ষ্য করেছে যে পহেলগাম হামলায় পাকিস্তানের কোনো সম্পৃক্ততার প্রমাণ দিতে পারেনি ভারত। ফলে পাকিস্তান এই আখ্যানের বৈশ্বিক লড়াইয়ে এক ধাপ এগিয়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। সংঘাতের সময় নিজেদের যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার বিষয়ে ভারতের দীর্ঘ তিন সপ্তাহের নীরবতা ইসলামাবাদের সামরিক অবস্থানকে আরও জোরালো করেছিল। পরবর্তীতে দেশটির শীর্ষ জেনারেল স্বীকার করেন যে কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে যদিও ভারত কখনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করেনি।

যুদ্ধবিরতির পূর্ণ কৃতিত্ব মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দিতে ভারতের অস্বীকৃতি পরবর্তী সময়ে ওয়াশিংটন ও নতুন দিল্লির কৌশলগত সম্পর্কে স্পষ্ট টানাপোড়েন তৈরি করে। অন্যদিকে পাকিস্তান ট্রাম্পের এই ভূমিকাকে দ্রুত আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় এবং তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করলেও বর্তমান মেয়াদে পাকিস্তানি সামরিক প্রধানের প্রশংসা করেছেন। এমনকি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো পাকিস্তানি সামরিক প্রধান হিসেবে জেনারেল মুনিরকে হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ জানান ট্রাম্প।

দীর্ঘদিন ধরে ভারতের পূর্ববর্তী সরকারগুলো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কৌশলগত সংযমের নীতি অনুসরণ করে আসছিল যাতে একটি সর্বাত্মক পারমাণবিক যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়। ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পরও তৎকালীন কংগ্রেস সরকার এই নীতি বজায় রেখেছিল যা বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় তীব্র সমালোচনা করে। মোদি ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে প্রতিবেশী প্রথম নীতির অধীনে লাহোর সফর করলেও ২০১৬ সালের পর থেকে সন্ত্রাস ও আলোচনা একসাথে চলতে পারে না নীতি গ্রহণ করেন।

সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বর্জন করার মাধ্যমে আঞ্চলিক এই সহযোগিতা সংস্থাটিকে কার্যকরভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেয় ভারত। এর পরিবর্তে বিমস্টেক জোটকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা একটি শক্তিশালী বা বিকল্প বৈশ্বিক মঞ্চ হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। অন্যদিকে চীনের সাথে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ক দিন দিন আরও মজবুত হয়েছে যেখানে গত সংঘাতের সময় তারা বেইজিংয়ের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক চাপ ও শুল্ক নীতি ভারতকে এক ধরনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বাতন্ত্র্যের সংকটে ফেলেছে।