জুন ১৮, ২০২৬, ০৮:৪৩ এএম
ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে বিশ্ব পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক পিছু হটা এবং দেশটির সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে এক বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ইরানকে সামরিকভাবে দমন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক মানচিত্র বদলে দিয়ে এক বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠার যে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নির্ধারণ করেছিলেন তা এখন কার্যত ভেস্তে গেছে।
গত ২৫ বছরে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে ওয়াশিংটনের নানা সামরিক হস্তক্ষেপের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ পরিস্থিতিকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও স্পর্শকাতর হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তবে আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া বা সিরিয়ার মতো বিপর্যয় এখানে ঘটেনি বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাত্মক শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টাকে সুনিপুণভাবে নসাৎ করে সফলভাবে টিকে গেছে। মূলত আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণে এবং সৌদি আরব নতুন নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল।
কিন্তু ওয়াশিংটনের নীতি পরিবর্তন ও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বিপর্যয় এখন স্পষ্ট।ইসরাইলের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক বন্ধু হিসেবে পরিচিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নেতানিয়াহুর জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক বিপর্যয় ও একাকীত্ব নিয়ে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য এই বিধ্বংসী যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে আকস্মিক সরে আসা ছিল মূলত নিজের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে খোদ যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি খরচ ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এর ফলে ট্রাম্পের নিজস্ব জনপ্রিয়তার রেটিং ঐতিহাসিকভাবে নিচে নেমে গেছে এবং নিজের রিপাবলিকান দলের ভেতরেই তিনি তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছেন। এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা ট্রাম্প পরিবারের নিজস্ব ব্যবসায়িক স্বার্থের ওপরও বড় ধরনের আর্থিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছিল।
সামনে দেশের মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় ট্রাম্প দ্রুত একটি ভেনিজুয়েলা-শৈলীর সহজ রাজনৈতিক বিজয় চেয়েছিলেন কিন্তু ইরান সহজে আত্মসমর্পণ না করায় তিনি এই সংঘাতের পথ থেকে সরে আসেন। ইসরাইলের ভেতরেও এই নতুন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নিয়ে ইতিমধ্যেই সামরিক ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। দেশটির প্রধান গোয়েন্দা সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে যে এই যুদ্ধের পর অঞ্চলটিতে মার্কিন সমর্থনে ইসরাইল শীর্ষ সামরিক শক্তি থাকার বদলে ইরান এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের নজিরবিহীন হামলার পর ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের এই চুক্তিকে নেতানিয়াহুর কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-সেভেন শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প সাংবাদিকদের স্পষ্ট বলেন যে মার্কিন সমর্থন ছাড়া ইসরাইলের কোনো অস্তিত্ব থাকত না এবং চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র দুই ঘণ্টা আগে বৈরুতে ইসরাইলি বিমান হামলার ঘটনাটি তিনি মোটেও পছন্দ করেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক ও নাটকীয় ভূমিকায় ইসরাইলি নীতি নির্ধারকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও চরম বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। তেল আবিবের উগ্র-ডানপন্থি এবং প্রধান বিরোধী দলগুলো এখন ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইসরাইলকে এককভাবে সামরিক পথে চলার জোর আহ্বান জানাচ্ছে। ইসরাইলের কট্টর বিরোধীদলীয় নেতারা এখন দেশকে একটি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক মিসাইল ফোর্স তৈরি এবং গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদকে ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎপখাতে একক মনোযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
দেশটির অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর সামরিক হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এমনকি নেতানিয়াহুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, জ্যারেড কুশনার এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।গাজা, দক্ষিণ লেবানন এবং সিরিয়ার অবরুদ্ধ অঞ্চলে ইসরাইলের দখলকৃত ভূমি এবং আবুধাবির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তা চুক্তি টিকে থাকলেও মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরাসরি সমর্থন হারানো নেতানিয়াহুর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক মিত্র হিসেবে ইসরাইলের নির্ভরযোগ্যতা আগের চেয়ে অনেক হ্রাস পেয়েছে এবং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে আইপ্যাক-এর মতো ইসরাইলি লবিং গ্রুপগুলোর গ্রহণযোগ্যতাও কমছে।
এই জটিল পরিস্থিতি সামাল দিতে ইসরাইলি লবি এখন মার্কিন কংগ্রেসে ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট এবং ইন্টেলিজেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্টের মাধ্যমে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সংস্থাকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিমালার সঙ্গে স্থায়ীভাবে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে যাতে কংগ্রেসকে বাইপাস করে অস্ত্র সরবরাহ বজায় রাখা যায়। কিন্তু এই নতুন আন্তর্জাতিক চুক্তির ফলে ইরান এক অপরাজেয় প্রধান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে।
উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ত্যাগ করার শর্ত মানলেও ইরান তার পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি এবং নিজস্ব প্রযুক্তিগত জ্ঞান সম্পূর্ণ বজায় রেখেছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী ইরানের কোনো পারমাণবিক বোমা তৈরির গোপন সামরিক কর্মসূচি ছিল না। একই সঙ্গে ইরানের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র বহর মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনীর সবচেয়ে ভারী ও নিখুঁত হামলা থেকেও সুরক্ষিত থেকেছে যা একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অ-রাষ্ট্রীয় মিত্রদের সঙ্গে তেহরানের অক্ষ ব্যবস্থা আরও জোরদার হয়েছে। যুদ্ধের ফলে উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা বা জিসিসি কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়েছে এবং আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বিশ্বের সামনে প্রকাশ পেয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো সম্পদশালী দেশগুলো এখন আমেরিকার ওপর ভরসা না করে ইরানের সঙ্গে নতুন সমঝোতা করে চলার দীর্ঘমেয়াদি নীতি বেছে নিচ্ছে। বিশেষ করে কৌশলগত হরমুজ প্রণালির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকায় উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই এখন তেহরানের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আঞ্চলিক ক্ষেত্রে এমন বড় ধাক্কা খাওয়ার পর নেতানিয়াহু নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা আরও জোরদার করতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে স্বাধীন বিশ্লেষকদের মতে ইসরাইল পুরো গাজা উপত্যকা পুনর্দখল করলেও হামাস বা হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কখনোই তাদের নিরস্ত্রীকরণ মেনে নেবে না। গাজার সামাজিক কাঠামো সমস্ত বর্বর নিপীড়ন সত্ত্বেও ভেঙে পড়েনি এবং নেতানিয়াহু যদি গাজায় পুনরায় পূর্ণ আক্রমণ চালান তবে বিশ্বজুড়ে ইসরাইলি পণ্য বর্জনের ডাক তীব্র হবে যা দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মোকাবিলা করা অসম্ভব হবে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের এই আগ্রাসী সম্প্রসারণবাদী নীতি শেষ পর্যন্ত তাদের নিজস্ব সামরিক ক্ষমতার সীমানায় পৌঁছে দিয়েছে এবং এটি ইসরাইলের জন্য একটি বড় ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।
তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন