অক্টোবর ১০, ২০২৬, ১১:০৩ এএম
একসময় যে বাঁশ ছিল চীনের বিপ্লবী সেনাদের যুদ্ধকালীন বেঁচে থাকার প্রধান সঙ্গী, সময়ের পরিক্রমায় সেই বাঁশই এখন দেশটির অর্থনীতির এক বিরাট শক্তিতে পরিণত হয়েছে। নদী পারাপারের ভেলা থেকে শুরু করে সেতু ও সামরিক সরঞ্জাম—সবকিছুই একসময় তৈরি হতো বাঁশ দিয়ে। বর্তমানে চীনের কু চুই প্রদেশে গড়ে উঠেছে আধুনিক বাঁশ শিল্প, যেখানে তৈরি হচ্ছে বহুমুখী পরিবেশবান্ধব পণ্য এবং বাড়ছে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি।
আজ থেকে ৯০ বছর আগে এই বাঁশই ছিল চীনের বিপ্লবী সেনাদের বেঁচে থাকার মূল অবলম্বন। নদী পার হতে তৈরি করা হতো ভেলা, বানানো হতো সেতু ও নানা সরঞ্জাম। এমনকি চরম খাদ্যসংকটের সময় বাঁশের কচি অঙ্কুরও খাওয়া হতো। সময়ের পরিক্রমায় সেই দিনগুলো বদলে গেছে। এখন সেই বাঁশই চীনের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় কু চুই প্রদেশের শিচুই শহরের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
শিচুই শহরে রয়েছে ৮৮ হাজার হেক্টরেরও বেশি বিস্তৃত বাসবন। পাহাড়জুড়ে ছড়ানো এই বিশাল বন কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেরই অনন্য অংশ নয়, বরং স্থানীয় মানুষের আয়ের একটি অত্যন্ত বড় উৎস। এই বাসবনগুলো স্থানীয়দের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আনতে যেমন সাহায্য করছে, তেমনি শিচুই শহরের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেও রাখছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান। বর্তমানে বাঁশের নানাবিধ আধুনিক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এটি বহুমুখী কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এবং অত্যাধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্য ও সামগ্রী তৈরি করা সম্পূর্ণ সম্ভব হচ্ছে।
চীনের বিপ্লবের সময় সেনারা বাঁশ দিয়ে ভেলা, ভাসমান সেতু, খুঁটি ও মশাল তৈরি করতেন। খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিলে তারা বাঁশের কচি অঙ্কুর খেয়ে জীবন বাঁচাতেন। ১৯৩৫ সালে শিচুই নদী চারবার অতিক্রম করেছিল রেড আর্মি। লং মার্চের সেই ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী হয়ে রয়েছে এই অঞ্চল। কিন্তু ইতিহাসের সেই সাধারণ বাঁশ এখন রূপ নিয়েছে আধুনিক ও লাভজনক শিল্পের প্রধান কাঁচামালে।
বর্তমানে বাঁশজাত পণ্য উৎপাদনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান। গত ২০২৫ সালে এই শহরে বাঁশ শিল্পের মোট উৎপাদন মূল্য ১০ বিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়ে গেছে, যা এই শহরের মোট জিডিপির প্রায় সাড়ে ছয় শতাংশ। এই আধুনিক যুগেও বাঁশের কাণ্ড কেটে ফালি করে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় ও শিল্পপণ্য। মেঝের টেকসই উপকরণ থেকে শুরু করে চামচ, কাটা চামচ ও ছুরি সবই তৈরি হচ্ছে এসব আধুনিক কারখানায়।
স্থানীয় উৎপাদন প্রক্রিয়ার মূল ধাপগুলো সম্পর্কে জানাতে গিয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রথমে বাঁশগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেরা হয় এবং এরপর সেগুলোকে সরু ফালি বা স্ট্রিপে রূপান্তর করা হয়। ফালি তৈরির প্রক্রিয়ায় যাওয়ার আগে শ্রমিকরা নির্দিষ্ট মাপ অনুযায়ী বাঁশগুলো কেটে নেন। প্রক্রিয়াজাত করা এই বাঁশের ফালি দিয়ে মূলত তিন রকমের পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি করা হয়।
পরিবেশবান্ধব পণ্যের তালিকাটিও বেশ দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়। হোটেল ও রেস্তোরাঁয় ব্যবহারের জন্য তৈরি হচ্ছে বাঁশের টুথব্রাশ, ফল পরিবেশনের কাঠি এবং পাল্পের তৈরি কাগজের স্ট্রসহ নানা প্রয়োজনীয় সামগ্রী। প্লাস্টিকের ক্ষতিকর বিকল্প হিসেবে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এসব পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। তাদের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে বাঁশের তৈরি ছুরি, কাটা চামচ ও চামচ। এসব পণ্যের প্রধান বৈদেশিক বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র। চীনের কু চুই অঞ্চলের এই বাঁশজাত পণ্য এখন জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন