মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬,

ভারতে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধের আহ্বান জানাল জাতিসংঘ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ২০, ২০২৬, ০৪:২২ পিএম

ভারতে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধের আহ্বান জানাল জাতিসংঘ

ছবি: সংগৃহীত

ভারতে গত তিন মাস ধরে রাজধানী নয়াদিল্লিসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে পুলিশের অব্যাহত দমনমূলক আচরণে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা।

বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ অবিলম্বে বন্ধ করা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের মৌলিক অধিকার সমুন্নত রাখা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি সরাসরি আহ্বান জানানো হয়েছে।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির ওপর আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ধারাবাহিক বলপ্রয়োগ একটি সামগ্রিক ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।

তারা ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে শান্তিপূর্ণভাবে মতামত প্রকাশ ও সমবেত হওয়ার নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।

বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া সমাবেশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ, অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, গুম এবং শিক্ষার্থী আন্দোলনকর্মীদের অন্যায়ভাবে লক্ষ্যবস্তু করার মতো ঘটনা নিয়ে তারা পূর্বেও ভারতের নীতিনির্ধারকদের সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। এ ধরনের নিপীড়ন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং দেশটিতে নাগরিকদের মৌলিক গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের সুযোগ ক্রমাগত সংকুচিত হওয়ার বাস্তব প্রমাণ।

বিবৃতিতে গত মার্চ মাসে নয়াদিল্লিতে দশজন শিক্ষার্থী ও শ্রমিক অধিকারকর্মীকে আটকের বিশেষ ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হয়। অভিযোগ অনুসারে, সাদা পোশাকধারী পুলিশ তাদের তুলে নিয়ে চব্বিশ ঘণ্টারও বেশি সময় সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখে। ওই সময়ে আটক ব্যক্তিদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, হুমকি ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সাজানো স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে আদালতের ‍‍`হেবিয়াস কর্পাস‍‍` বা বন্দি হাজির সংক্রান্ত আইনি নির্দেশের পর তারা মুক্তি লাভ করেন।

গত কয়েক মাসে ভারতের বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গন ও রাজপথে লাখ লাখ শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষ সমবেত হয়ে সরকারের একাধিক শিক্ষা সংস্কারের প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন।

এর পাশাপাশি ভোটার তালিকা থেকে ব্যাপক হারে নাম বাদ দেওয়ার পদক্ষেপের বিরুদ্ধেও তীব্র জনবিক্ষোভ গড়ে ওঠে। জাতিসংঘের বিবৃতিতে বলা হয়, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রশাসনিক পদক্ষেপে অন্তত ১৩ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশ মুসলিম সংখ্যালঘু এবং দলিত ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।

বিশেষজ্ঞরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সমাবেশগুলো সম্পূর্ণ অহিংস হওয়া সত্ত্বেও পুলিশ কোনো প্ররোচনা ছাড়াই নিরস্ত্র তরুণদের ওপর নির্বিচার লাঠিচার্জ করেছে। এর পাশাপাশি হাজার হাজার নাগরিককে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পৌঁছাতে বিভিন্ন কৌশলে বাধা দেওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে সাত হাজারের বেশি তরুণ, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী এবং রাজনৈতিক নেতাদের নির্বিচারে আটক করা হয়। তাদের শহরের বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অস্থায়ী আটককেন্দ্রে স্থানান্তর করে মুঠোফোন জব্দ করা হয় এবং প্রতিবাদ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও ও নথিপত্র জোরপূর্বক মুছে ফেলা হয়। যদিও ২৪ ঘণ্টা পর আন্দোলনের নেতাদের অধিকাংশকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

বিক্ষোভস্থল ও পুলিশি হেফাজতে আন্দোলনকারীদের আহত হওয়া, লাঞ্ছনা এবং নির্যাতনের খবরে চরম উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ।

বিশেষভাবে আটক নারী ও তরুণদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন সহিংসতা এবং লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়নের অভিযোগকে অত্যন্ত গুরুতর আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

জনসমাগম রুখতে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করার কঠোর সমালোচনা করেন বিশেষজ্ঞরা। এই ধারা জারির মাধ্যমে কার্যত পুরো শহরকে অবরুদ্ধ করা হয়, গণপরিবহন স্থগিত রাখা হয় এবং মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারা স্পষ্ট করেন, এমন বিধিনিষেধ আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের সরাসরি বরখেলাপ।

বিবৃতিতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে ডিজিটাল মাধ্যমে বায়োমেট্রিক নজরদারি ও ইন্টারনেট বন্ধের অপকৌশল পরিহার করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর বাড়াবাড়ি ও নির্যাতনমূলক আচরণের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।