অক্টোবর ২০, ২০২৬, ১১:১৯ এএম
পোষা বিড়ালের শরীরে এমন একটি ক্ষতিকর পরজীবীর উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে, যা মানবদেহেও সংক্রমণ ছড়াতে সক্ষম। উত্তর আমেরিকায় দেড় লাখেরও বেশি গৃহপালিত বিড়ালের মলের নমুনা ব্যাপকভাবে বিশ্লেষণ করে গবেষকদের একটি আন্তর্জাতিক দল এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছেন।
গবেষণায় উঠে এসেছে, গরমের দিনের তুলনায় শীতকালে বিড়ালের দেহে এই পরজীবীর বিস্তার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ঘটে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী পিএলওএস ওয়ান (PLOS One)-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি উদ্ধৃত করে ১৭ অক্টোবর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিজ্ঞানবিষয়ক সংবাদমাধ্যম সায়েন্সঅ্যালার্ট।
গবেষক দলটির অনুসন্ধানের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল Giardia duodenalis নামের একটি বিশেষ ধরনের এককোষী প্রোটোজোয়া পরজীবী।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা গৃহপালিত বিড়ালের মোট এক লাখ ৫৭ হাজারের বেশি মলের নমুনা দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। উত্তর আমেরিকার ইতিহাসে পোষা বিড়ালের ওপর পরিচালিত এটিই এযাবৎকালের সর্ববৃহৎ পরজীবী-সংক্রান্ত গবেষণা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরা।
পরীক্ষিত নমুনাগুলোর মধ্যে মোট ৯ হাজার ৯৬২টিতে এই পরজীবীর সুনির্দিষ্ট উপস্থিতি ধরা পড়ে।
অর্থাৎ সার্বিক পরীক্ষার হিসাবে শনাক্তের হার দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অঞ্চলটিতে প্রতি ১৬টি পোষা বিড়ালের মধ্যে অন্তত একটির শরীরে এই পরজীবী সক্রিয় ছিল।
সবচেয়ে উদ্বেগের দিক হলো, পরজীবী পাওয়া গেছে এমন নমুনাগুলোর মধ্যে এক হাজার ৮৪০টিতে এমন জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত হয়েছে, যা সরাসরি মানুষের শরীরে রোগ ছড়াতে পুরোপুরি সক্ষম।
আক্রান্ত নমুনার অনুপাতে এই ঝুঁকির হার ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। আর সামগ্রিক নমুনার হিসাবে মানবদেহে সংক্রমণ ছড়াতে পারে এমন পরজীবীর উপস্থিতি মিলেছে প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ ক্ষেত্রে।
সাধারণ অবস্থায় এই পরজীবী শরীরে প্রবেশ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান কোনো উপসর্গ প্রকাশ নাও পেতে পারে। তবে এটি মানুষ ও বিভিন্ন গৃহপালিত প্রাণীর শরীরে জিয়ার্ডিয়াসিস নামের একটি মারাত্মক অন্ত্রের রোগের সৃষ্টি করে। এই রোগে আক্রান্ত হলে তীব্র ডায়রিয়া, পেটে প্রচণ্ড ব্যথা ও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। পাশাপাশি আক্রান্ত পশুর স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধিও থমকে যেতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়ালের বয়সের ওপর ভিত্তি করে সংক্রমণের মাত্রায় স্পষ্ট তারতম্য রয়েছে।
বিড়ালছানাদের মধ্যে এই পরজীবী শনাক্তের হার ছিল সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। এর বিপরীতে ১০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ বিড়ালের ক্ষেত্রে সংক্রমণের হার নেমে আসে ১ দশমিক ৩ শতাংশে। লিঙ্গভেদে স্ত্রী বিড়ালের তুলনায় পুরুষ বিড়ালগুলোর মধ্যে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা কিছুটা বেশি লক্ষ্য করা গেছে।
যেসব প্রাপ্তবয়স্ক বিড়ালের প্রজনন ক্ষমতা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বন্ধ বা বন্ধ্যাকরণ করা হয়নি, তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বন্ধ্যাকরণ করা বিড়ালের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। তবে বিড়ালছানাদের ক্ষেত্রে এই চিত্রে সম্পূর্ণ উল্টো ফলাফল দেখা গেছে।
ভৌগোলিক অঞ্চল ও আবহাওয়া ভেদেও পরজীবীর প্রকোপে লক্ষণীয় পার্থক্য মিলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে বিড়ালের মধ্যে পরজীবী শনাক্তের হার ছিল সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে শনাক্ত হওয়া নমুনাগুলোতে মানবদেহে সংক্রমণযোগ্য জিনগত ধরনের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশি, যার হার ২১ দশমিক ৬ শতাংশ।
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সংক্রমণের হারের একটি বড় সম্পর্ক রয়েছে। গ্রীষ্মকালে পরজীবী শনাক্তের হার ছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ, যা শীতকালের তীব্র ঠান্ডায় বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ১ শতাংশে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে আর্দ্র আবহাওয়ায় এই পরজীবীর সিস্ট দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু গ্রীষ্মের শুষ্ক ও উত্তপ্ত আবহাওয়ায় সেগুলোর টিকে থাকার শক্তি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।
মানুষ ও পোষা প্রাণী উভয়কেই আক্রান্ত করার সক্ষমতা থাকায় এই পরজীবীকে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি নতুন সতর্কবার্তা বলে মনে করছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা।
গবেষকদের পরামর্শ, যেসব পরিবারে ছোট শিশু, প্রবীণ সদস্য কিংবা জটিল রোগে আক্রান্ত স্বল্প রোগ প্রতিরোধক্ষমতার মানুষ বসবাস করেন, সেসব পরিবারের পোষা বিড়ালের মলের নমুনা নিয়মিত পশুচিকিৎসকের কাছে নিয়ে পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি।
তবে এই পুরো গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ভৌগোলিক ও পরিবেশগত কাঠামোর ওপর পরিচালিত হওয়ায় বাংলাদেশের স্থানীয় পোষা বিড়ালের ক্ষেত্রে এই সংক্রমণের সঠিক হার নিরূপণে আরও স্বতন্ত্র স্থানীয় বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন