ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬, ১০:৫৩ এএম
কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করা প্রাণঘাতী মাদক ইয়াবা নিয়ন্ত্রণ করা বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই সমস্যা বহু পুরোনো হলেও বর্তমানে এর ভয়াবহতা নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে। মন্ত্রী নিজে কক্সবাজার জেলার সংসদ সদস্য হওয়ায় স্থানীয় ও জাতীয় উভয় পর্যায়েই তার ওপর মানুষের প্রত্যাশার চাপ অনেক বেশি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, জেলার মাদক সিন্ডিকেট ও গডফাদারদের বিষয়ে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত জ্ঞান থাকায় ইয়াবা নিয়ন্ত্রণে তার ব্যর্থতা বা সফলতা তার ক্যারিয়ারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ইয়াবার চালান দেশে প্রবেশ করছে। গত কয়েক বছরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর হাতে জব্দ হওয়া মাদকের পরিমাণ বেড়েছে। দিনে গড়ে প্রায় এক লাখের বেশি ইয়াবা বড়ি উদ্ধার হচ্ছে। তবে এর বিপরীতে বাজারে ইয়াবার সহজলভ্যতা কমেনি।
বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে নেতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তাদের মতে, সরবরাহের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার কারণেই এখন ধরা পড়ার সংখ্যাও বেড়েছে। এই চক্র ভাঙতে না পারলে মাদক সাম্রাজ্য আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান মন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নতুন অপারেশনাল মডেল চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
টেকনাফ ও নাফ নদীর মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ড্রোন নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সীমান্তের প্রধান ১২টি পাচার রুট নিয়ন্ত্রণে বিশেষ মোবাইল ইউনিট মোতায়েন এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি জোরদার করার কথা ভাবা হচ্ছে। ইয়াবা মামলাগুলোর অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও বিজিবির সমন্বয়ে একটি বিশেষ যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাবও এখন টেবিলে রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কক্সবাজারে ১৪৪টি ইয়াবা মামলার রায় হয়েছে। এর মধ্যে ১০৩ জন আসামির সাজা হয়েছে এবং ৩০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশই রোহিঙ্গা। মিয়ানমারের পাচারকারীদের সাথে স্থানীয় রোহিঙ্গা চক্রের সরাসরি যোগাযোগ ইয়াবা পাচারকে সহজ করে দিয়েছে। ক্যাম্পের ভেতরের গোপন পথ ও দুর্গম পাহাড়ি রুটগুলো এখন পাচারকারীদের প্রধান আস্তানা হয়ে দাঁড়িয়েছে।পদ্ধতিগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বর্তমানে ড্রাগ ডিটেকশন ডগ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগে পাচারকারীরা মূলত নৌ ও পাহাড়ি পথ ব্যবহার করত, কিন্তু এখন নবনির্মিত রেললাইন দিয়েও ইয়াবা পরিবহনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
রেলপথে দ্রুত মাদক শনাক্ত করার জন্য পর্যাপ্ত ডগ স্কোয়াড ও আধুনিক স্ক্যানার প্রয়োজন। এছাড়া কক্সবাজার জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, কেবল অভিযান চালিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। এলাকার ২৮ লাখ মানুষের বিশাল অংশ অর্থনৈতিক সংকটে থাকায় তারা সহজেই পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ছে। বেকার যুবকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে না পারলে এই মাদক সাম্রাজ্যের ভিত্তি উপড়ে ফেলা কঠিন হবে বলে মনে করেন জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন