বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬,

বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের: আইনমন্ত্রী

জাতীয় ডেস্ক

এপ্রিল ১৬, ২০২৬, ০২:২৮ পিএম

বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের: আইনমন্ত্রী

সংসদে আইনমন্ত্রীর ভাষণ

বিচারকদের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে অতীতের দলীয় আনুগত্যের সংস্কৃতি পরিহার করে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত ক্ষমতা নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে বর্তমান সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না এবং সততা ও দক্ষতাই হবে বিচারকদের মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড। 

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৫তম দিনের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন।চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী অতীতের বিচারিক পরিবেশের সমালোচনা করেন। 

তিনি বলেন যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিচারকদের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হতো। যারা স্বাধীনভাবে বিচার কার্য পরিচালনার চেষ্টা করতেন, তাঁদের সুপ্রিম কোর্টের সহায়তায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করে কার্যত শাস্তি দেওয়া হতো বলে তিনি অভিযোগ করেন। 

বর্তমান সরকার সেই পথ অনুসরণ করবে না উল্লেখ করে আসাদুজ্জামান বলেন যে আইন মন্ত্রণালয় কেবল সুপারিশ করবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকবে একমাত্র সুপ্রিম কোর্টের হাতে।দেশের বিচার ব্যবস্থায় ঝুলে থাকা বিশাল মামলার জট নিরসনে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের তথ্যও সংসদে পেশ করেন আইনমন্ত্রী। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ফৌজদারি কার্যবিধি আইন (সংশোধন)-২০২৬ পাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

এই নতুন আইনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে এসএমএস এবং ভয়েস কলের মাধ্যমে সমন জারি করার নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে আরজি দাখিল ও সরাসরি জেরার প্রক্রিয়া প্রবর্তন করা হয়েছে যা বিচার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করবে।বিচারক ও জনবল সংকট কাটাতে সরকার ব্যাপক নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করেছে বলে মন্ত্রী সংসদকে অবহিত করেন। ইতিমধ্যে মামলার জট নিরসনে ৮৭১টি আদালত এবং ২৩২টি বিচারকের নতুন পদ সৃজন করা হয়েছে। 

এর বাইরে আরও ৩০৪টি বিচারকের পদ তৈরির প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগের কার্যক্রমও শেষের দিকে। কেবল বিচারক নয়, বিচার বিভাগের দাপ্তরিক কাজ ত্বরান্বিত করতে স্টেনো-টাইপিস্ট ও অফিস সহায়কের মতো শূন্যপদগুলোতে ১ হাজার ২৬১ জন কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা ফজলে হুদার এক প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী জানান যে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের যেসব আইন বর্তমানে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে, সেগুলো সংস্কারে ল কমিশন কাজ করছে। কমিশনের সুপারিশ প্রাপ্তি সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে নতুন আইন প্রণয়ন বা সংশোধন করা হবে। 

এ ছাড়া বিচারকদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালে ৪৬৭ জন এবং ২০২৬ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৯৩ জন বিচারককে পেশাগত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। বিচার ব্যবস্থাকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তরের লক্ষ্যে ‘ই-জুডিশিয়ারি’ শীর্ষক একটি বড় প্রকল্প বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন যে বিগত সরকারের আমলে হয়রানিমূলক উদ্দেশ্যে করা মামলাগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য বর্তমান সরকার একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। 

তবে কোনো হত্যা মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বর্তমানে দুই জেলায় ই-ফ্যামিলি কোর্ট চালুর মাধ্যমে পারিবারিক মামলার কার্যক্রম অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে যা ক্রমান্বয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। ডিজিটাল এই ব্যবস্থার ফলে বিশেষ করে নারী ও শিশুদের বিচারপ্রাপ্তি আরও সহজ ও সাশ্রয়ী হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। আইনমন্ত্রী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন যে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে সরকার একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।