বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬,

ইউপি নির্বাচন শুরু ২১ জানুয়ারি বিশৃঙ্খলা করলে প্রার্থিতা বাতিলের হুঁশিয়ারি

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ১২:১৬ পিএম

ইউপি নির্বাচন শুরু ২১ জানুয়ারি বিশৃঙ্খলা করলে প্রার্থিতা বাতিলের হুঁশিয়ারি

আগামী বছরের ২৭ মের মধ্যে পাঁচ ধাপে দেশের প্রায় ৪ হাজার ৩০০টি ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন করার সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথম ধাপে আগামী ২১ জানুয়ারি প্রায় ৮০০ ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তবে নির্বাচনে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার, পেশিশক্তির প্রয়োগ কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালালে তাৎক্ষণিক আইনি শাস্তির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষেত্রেও কঠোর অবস্থান নেবে কমিশন।

নির্বাচনি পরিবেশ বিঘ্নিত করার চেষ্টা করা হলে তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে মাঠে জুডিশিয়াল ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। কোনো প্রার্থী নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সরাসরি তার প্রার্থিতা বাতিলের আইনি বিধান কার্যকর করা হবে।

নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পাঁচ ধাপে ৪ হাজার ৩০০টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনি পরিবেশ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি গভীরভাবে বিবেচনায় নিয়ে ধাপভিত্তিক এলাকা নির্ধারণ করা হবে। প্রথমে জেলা সদর সংলগ্ন এবং পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে উপজেলা সদরের নিকটবর্তী ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে ভোট সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো সহজ হবে। প্রয়োজনে সংলগ্ন জেলাগুলো থেকেও অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা যাবে।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে উচ্চ মানদণ্ড রয়েছে, সেই ধারাবাহিকতায় একটি সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে কমিশন আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবে। কমিশনের নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। ভালো একটি নির্বাচন উপহার দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই তারা দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং আইন অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য ভোট নিশ্চিত করতে যা যা পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, তার সবই বাস্তবায়ন করা হবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, নির্বাচনি প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। দলগুলোর আন্তরিক সহযোগিতা চাওয়া হবে, যাতে সম্মিলিতভাবে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনি পরিবেশ বজায় রাখা যায়।

নির্বাচনে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব বিস্তার প্রতিহত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে এই নির্বাচন কমিশনার জানান, ভোট চলাকালে মাঠে সার্বক্ষণিকভাবে জুডিশিয়াল এবং এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটরা তৎপর থাকবেন। কোনো ব্যক্তি নির্বাচনি স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্টের চেষ্টা করলে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের প্রতি অনুরাগ না দেখিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, নির্বাচনি মাঠে মারামারি, অরাজকতা বা পেশিশক্তির অপব্যবহার কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। কোনো প্রার্থী এমন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হলে তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি সরাসরি প্রার্থিতা বাতিল করা হতে পারে। তবে কমিশনের মূল লক্ষ্য শুধুই কাউকে শাস্তি প্রদান বা ভোট বাতিল করা নয়, বরং নাগরিকরা যাতে আইন মেনে চলেন এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকেন, সেই সচেতনতামূলক পরিবেশ তৈরি করাই তাদের উদ্দেশ্য।

এর আগে নির্বাচন কমিশন সভা শেষে পাঁচ ধাপে ইউপি নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।

ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপ, ২৯ এপ্রিল তৃতীয় ধাপ, ১৩ মে চতুর্থ ধাপ এবং সর্বশেষ ২৭ মে পঞ্চম ধাপের নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে।

আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ উল্লেখ করেন, মেয়াদোত্তীর্ণ প্রায় ৪ হাজার ৩০০টি ইউনিয়ন পরিষদে আইনগত বাধ্যবাধকতা মেনে ২০২৭ সালের ২৭ মের মধ্যেই সব নির্বাচন শেষ করতে হবে। প্রতিটি ধাপের তফসিল নিজ নিজ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা ঘোষণা করবেন, যা সাধারণত সংশ্লিষ্ট ধাপের ভোটগ্রহণের প্রায় ৪২ থেকে ৪৫ দিন আগে জারি করা হবে।

নির্বাচনি অপরাধে কারাদণ্ড ও জরিমানার কঠোর বিধান

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রভাব বিস্তার, বলপ্রয়োগ কিংবা ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়ার মতো যেকোনো অপরাধ দমনে সংশোধিত নির্বাচনি বিধিমালায় কঠোর সাজার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) সংশোধিত নির্বাচন বিধিমালার ৮০(ক) বিধি অনুসারে, নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়া, ভীতি প্রদর্শন করা কিংবা শারীরিক আঘাত বা বলপ্রয়োগ করে দায়িত্বে বাধা দেওয়ার অপচেষ্টা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একইসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের অনুমোদিত গণমাধ্যম প্রতিনিধি কিংবা পর্যবেক্ষকদের স্বাভাবিক পেশাগত কাজে বাধা প্রদান, তাদের শারীরিক ক্ষতিসাধন বা নির্বাচনি দায়িত্বে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি নষ্ট করাও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

পাশাপাশি সাধারণ কোনো ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে যাতায়াতে বাধা সৃষ্টি করা, কোনো বৈধ প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমাদানে নিবৃত্ত করা কিংবা জোরপূর্বক মনোনয়ন প্রত্যাহারে বাধ্য করার মতো অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা দোষী সাব্যস্ত হলে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড, অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

সংশোধিত বিধিমালার ক্ষমতাবলে প্রার্থিতা বাতিলের প্রক্রিয়াও সুস্পষ্ট করা হয়েছে। নির্ভরযোগ্য কোনো উৎস বা আনুষ্ঠানিক লিখিত রিপোর্টের ভিত্তিতে যদি কমিশনের কাছে এটি নিশ্চিত হয় যে চেয়ারম্যান বা সদস্য পদের কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনি এজেন্ট আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন, তবে কমিশন তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ দেবে। তদন্তে সংশ্লিষ্ট প্রার্থী, তার এজেন্ট কিংবা তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে বিধি লঙ্ঘনের সত্যতা প্রমাণিত হলে কমিশন লিখিত নির্দেশের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে ওই প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে।

অনিয়মে ফল স্থগিত ও পুনর্নির্বাচনের ক্ষমতা

ভোটকেন্দ্রে কারসাজি বা অনিয়মের কারণে কোনো কেন্দ্রের ফলাফল গুরুতরভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হলে তা স্থগিত করার আইনি ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হাতে সংরক্ষিত রয়েছে। সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী, পেশিশক্তির মহড়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা যেকোনো কারচুপির মাধ্যমে ফলাফল প্রভাবিত হওয়ার প্রমাণ পেলে এক বা একাধিক কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত ঘোষণা করা যাবে। পরবর্তীতে অনুসন্ধান চালিয়ে সত্যতা মিললে কমিশন সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রের নির্বাচন পুরোপুরি বাতিল করে সেখানে নতুন করে ভোটগ্রহণের আদেশ জারি করতে পারবে।

এছাড়া নির্বাচনি অপরাধ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করতে প্রতিটি ধাপে তফসিল ঘোষণার পর উপযুক্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভিজিল্যান্স ও মনিটরিং কমিটি গঠন করা হবে, যা পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।