বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬,

বিএনপির সামনে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক সংকট

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৯:৫৭ এএম

বিএনপির সামনে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক সংকট

বিএনপির রাজনৈতিক পথচলা

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার মহাঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক আমূল পরিবর্তনের সূচনা করেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর নির্বাচনে জয়ী হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যখন রাষ্ট্রক্ষমতার গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তখন তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ। 

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, কোনো কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার পতনের পর নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য প্রথম এবং প্রধান কাজ হলো গণতান্ত্রিক সংহতকরণ। কিন্তু বিএনপির জন্য এই পথটি মসৃণ নয়। তারা একদিকে যেমন উদার গণতান্ত্রিক আদর্শের দাবিদার, অন্যদিকে তাদের দলের অভ্যন্তরে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো এই যাত্রাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

বিএনপির সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক সংকট হলো তাদের আদর্শিক অবস্থান। দলটি ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ওপর দাঁড়িয়ে যা মূলত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক পরিচয়ের দাবি করে। 

তবে জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে জুলাই সনদ এবং সংস্কারের যে নাগরিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে বিএনপির চিরাচরিত অবস্থানের একটি সূক্ষ্ম দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষত বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির এই মহাবিপ্লবকালে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদকে রাজনীতির আদর্শ হিসেবে জেন-জি বা এআই প্রজন্মের কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য করা যাবে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। রাষ্ট্র পরিচালনার যান্ত্রিক শৃঙ্খলা আর বিপ্লবের উত্তাল আবেগের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন দলটির প্রধান রাজনৈতিক পরীক্ষা।

বিএনপির জন্য আরেকটি সংবেদনশীল চ্যালেঞ্জ হলো দলের ঐতিহাসিক আদর্শিক ভিত্তি থেকে সরে আসার আশঙ্কা। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনে যে ইসলামি মূল্যবোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং জাতীয় সংস্কৃতির প্রতিফলন ছিল, সেখান থেকে বিচ্যুতি দলটির জন্য একটি গুরুতর রাজনৈতিক ভুল হতে পারে। জিয়াউর রহমানের সময়ে সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস বাক্যাংশ সংযোজন ছিল বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতার একটি স্বীকৃতি। 

তবে বর্তমান নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের রাজনৈতিক ভাষ্য তুলে ধরছেন, তা পশ্চিমা সেক্যুলার লিবারেল গণতন্ত্রের আদর্শের সঙ্গে একটি অন্তর্নিহিত সংঘর্ষ সৃষ্টি করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে দলটি কীভাবে ইসলামি মূল্যবোধ এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে সেটিই দেখার বিষয়।

রাজনৈতিক আদর্শের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা বিএনপির ভাবমূর্তিকে চরম সংকটে ফেলেছে। ক্ষমতা হস্তান্তরের পরপরই একশ্রেণির নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব এবং সহিংসতার অভিযোগগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে কর্মীদের মধ্যে যে লুণ্ঠনমূলক আচরণের প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা বহুত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপন্থী। বিএনপি যদি তাদের কর্মীদের এই সহিংস ও আধিপত্যকামী সংস্কৃতি থেকে বের করে আনতে না পারে, তবে জুলাই বিপ্লবের মূল স্পিরিট বৈষম্যহীনতা শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

বিএনপির জন্য বর্তমান সময়টি শুধু ক্ষমতায় থাকার নয়, বরং বিশাল জনআকাঙ্ক্ষার প্রত্যাশার চাপে টিকে থাকার পরীক্ষা। দলটিকে শুধু একটি নির্বাচনমুখী যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং একটি জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। দলের ভেতরকার দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করা না গেলে গণঅভ্যুত্থানের ফসল অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির হাতে চলে যাওয়ার প্রচণ্ড ঝুঁকি রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে নিজেদের একটি আধুনিক ও সংস্কারমুখী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই এখন বিএনপির জন্য দীর্ঘমেয়াদি এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।