এপ্রিল ২, ২০২৬, ০৪:৫৭ পিএম
সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য একটি নিরপেক্ষ ও দক্ষ প্রশাসনের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রশাসনে যদি নিরপেক্ষতা এবং পেশাদারিত্বের অভাব থাকে, তবে রাষ্ট্রে কেবল বিশৃঙ্খলা, লুটপাট এবং চরম অস্থিরতাই তৈরি হয় না, বরং এমন পরিস্থিতি বিদেশি বা আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি অডিটোরিয়ামে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রুহুল কবির রিজভী তাঁর বক্তব্যে জাতীয় ঐক্যের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, আমরা যদি জাতীয় স্বার্থে নিজেদের ঐক্য ধরে রাখতে পারি, তবে বিশ্বের কোনো শক্তিই বাংলাদেশকে গ্রাস করতে পারবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পটভূমি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি জানান, এ দেশের স্বাধীনতা কেবল নয় মাসের একটি সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এর পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক সংগ্রামের এক গৌরবময় ধারাবাহিকতা। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ থেকে শুরু করে এই অঞ্চলের মানুষ বারবার তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের চেষ্টা করেছে। বারবার সেই আকাঙ্ক্ষাকে দমন করার চেষ্টা হলেও মানুষ প্রতিবারই অদম্য সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে।বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপট বোঝাতে গিয়ে রিজভী ভিয়েতনামের যুদ্ধের উদাহরণ টেনে আনেন।
তিনি বলেন, একটি জাতি কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী বিদেশি শাসন এবং দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করে পৃথিবীতে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে, ভিয়েতনাম তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধও ছিল ঠিক তেমনি একটি জনযুদ্ধ। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, স্বাধীনতার ইতিহাসকে বিভিন্ন সময় বিকৃতভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা হয়েছে। কখনও কখনও এ যুদ্ধকে কেবল ভারত-পাকিস্তানের লড়াই হিসেবে দেখানোর অপচেষ্টা চলে। অথচ প্রকৃত সত্য হচ্ছে, এটি ছিল এ দেশের আপামর জনসাধারণের প্রাণের যুদ্ধ।
ইতিহাসের বিকৃতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, স্বাধীনতার সমস্ত অবদান কেবল একটি নির্দিষ্ট পরিবার বা একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখার এক ধরনের রাজনৈতিক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এই মানসিকতা জাতির আত্মাকে কলুষিত করেছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র এবং সেনাবাহিনীসহ সর্বস্তরের মানুষের রক্তক্ষয়ী ত্যাগের বিনিময়ে।
আর এই সাধারণ মানুষের মধ্য থেকেই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা উঠে এসেছিলেন। তরুণ প্রজন্মের কাছে এই সত্য ইতিহাস সঠিকভাবে পৌঁছাতে না পারার আক্ষেপও করেন তিনি। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, বর্তমান সময়ের তরুণেরা সত্য বুঝতে শুরু করেছে এবং যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার হচ্ছে।
স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রুহুল কবির রিজভী বলেন, কেবল একটি মানচিত্র বা ভৌগোলিক সীমানা পেলেই একটি জাতি পূর্ণ স্বাধীনতা পায় না। নাগরিক স্বাধীনতা, ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের অবাধ অধিকার এবং আইনের শাসন যদি নিশ্চিত না হয়, তবে সেই স্বাধীনতা অপূর্ণ থেকে যায়। তাঁর মতে, গণতন্ত্রের মূল স্পিরিট হলো মানুষের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। যদি কোনো রাষ্ট্রে কেবল একটি দল বা একজন নেতার কণ্ঠস্বরই ধ্রুব সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়, তবে তাকে আর যাই হোক গণতন্ত্র বলা যায় না।
প্রশাসনের রাজনৈতিকীকরণের সমালোচনা করে রিজভী বলেন, বর্তমান সময়ে কর্মকর্তাদের নিয়োগ বা পদায়নের ক্ষেত্রে `কে আমাদের লোক` কিংবা কে কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক—এমন বিচার করা হচ্ছে। বিভাগীয় কমিশনার বা ডিসিদের রাজনৈতিক পরিচয়ে বিচার করার এই সংস্কৃতি বিভাজনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এভাবে চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত দেশের গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র কাঠামো—দুটোরই চরম অধঃপতন ঘটবে। তাই রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের স্বার্থে প্রশাসনকে সব ধরনের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এখন সময়ের দাবি।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন