বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬,

সন্তানের পাপের কারণে কি মা-বাবার শাস্তি হবে?

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

এপ্রিল ২২, ২০২৬, ০৬:০৯ পিএম

সন্তানের পাপের কারণে কি মা-বাবার শাস্তি হবে?

ইসলামি জীবন বিধান

মৃত্যু প্রাণীজীবনের এক অমোঘ এবং অবিচ্ছেদ্য সত্য যা থেকে পালানোর কোনো পথ কারো জানা নেই। মহান রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে মৃত্যুকে অবধারিত ঘোষণা করেছেন এবং প্রতিটি প্রাণীকে এর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে বলে সতর্ক করেছেন। পার্থিব জীবনের চাকচিক্য মানুষকে অনেক সময় মোহাচ্ছন্ন করে রাখলেও পরকালের অনন্ত যাত্রা ও সেখানে নিজ নিজ কর্মের প্রতিফল পাওয়া নিশ্চিত। 

এই প্রেক্ষাপটে মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যকার সম্পর্ক এবং পরকালীন জবাবদিহিতা নিয়ে মুমিনদের মনে প্রায়ই নানা জিজ্ঞাসা তৈরি হয়। বিশেষ করে সন্তানের কোনো ভুল বা পাপের কারণে মা-বাবাকে কবরে শাস্তি ভোগ করতে হবে কি না, তা নিয়ে অনেকেই ধর্মীয় ব্যাখ্যা খুঁজে থাকেন।

ইসলামি শরিয়তের মৌলিক নির্দেশনা অনুযায়ী, সন্তান পৃথিবীতে আসার পর থেকেই মা-বাবার ওপর কিছু বিশেষ দায়িত্ব অর্পিত হয়। শৈশব থেকে সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালনা করা এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝিয়ে দেওয়া মা-বাবার অন্যতম প্রধান কাজ। 

পবিত্র কোরআনের সুরা তাহরিমের একটি আয়াতে মহান আল্লাহ বিশ্বাসীদের নির্দেশ দিয়েছেন যাতে তারা নিজেদের এবং তাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের কঠিন আগুন থেকে রক্ষা করে। এই নির্দেশনার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পরিবারের সদস্যদের বিশেষ করে সন্তানদের ধর্মীয় ও নৈতিক আদর্শে গড়ে তোলার দায়িত্ব সরাসরি অভিভাবকদের ওপর বর্তায়।সন্তানের পাপাচারের দায়ভার মা-বাবার ওপর আসবে কি না, তা মূলত নির্ভর করে মা-বাবার সদিচ্ছা ও প্রচেষ্টার ওপর। 

ইসলামি বিধান অনুসারে, যদি কোনো মা-বাবা তাদের সন্তানকে সঠিক শিক্ষা না দেন কিংবা ইসলামে নিষিদ্ধ কোনো কাজে বাধা না দিয়ে বরং পরোক্ষ সমর্থন জোগান, তবে সেই পাপের একটি অংশ তাদের আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে। এমনকি মৃত্যুর পরও সেই দায় থেকে তারা মুক্ত হতে পারবেন না। হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, কেউ যদি কোনো মন্দ কাজের প্রচলন করে বা তাতে উৎসাহ দেয়, তবে তার অনুসারীদের সমান পাপের ভাগীদার তাকেও হতে হবে। 

তাই সন্তান যদি ভুল পথে চলে এবং মা-বাবা তাকে সংশোধনের চেষ্টা না করেন, তবে সেই অবহেলার জন্য পরকালে তাদের কঠিন জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হতে পারে।তবে এর উল্টো দিকটিও শরিয়তে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রখ্যাত ইসলামি স্কলারদের মতে, যদি কোনো মা-বাবা তাদের সন্তানদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করেন এবং পাপাচার থেকে দূরে রাখতে সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যান, তবে তারা তাদের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হবেন। 

এমন প্রচেষ্টার পরও যদি সন্তান নিজের ইচ্ছায় কোনো অনৈতিক বা গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়, তবে তার জন্য মা-বাবাকে কবরে বা হাশরের ময়দানে কোনো শাস্তি ভোগ করতে হবে না। অর্থাৎ সন্তানদের ব্যক্তিগত অপরাধের জন্য নির্দোষ মা-বাবাকে অভিযুক্ত করা হবে না, যদি তারা দুনিয়াতে তাদের পালনীয় কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করে থাকেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস থেকে জানা যায় যে, মানুষের মৃত্যুর পর সব আমল বন্ধ হয়ে গেলেও তিনটি বিষয় জারি থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো এমন নেক সন্তান যে তার মা-বাবার জন্য দোয়া করে। এর মানে হলো সন্তানের ভালো কাজের সওয়াব যেমন মা-বাবার কাছে পৌঁছায়, তেমনি মা-বাবার অবহেলার কারণে সন্তানের করা পাপের বোঝাও তাদের বইতে হতে পারে। 

তাই মা-বাবার উচিত সন্তানকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যাতে তারা পরকালে মুক্তির উসিলা হতে পারে। সন্তানদের পাপাচার থেকে মুক্ত রাখতে মা-বাবাকে শুরু থেকেই ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মা-বাবার দায়িত্ব কেবল অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করা নয়, বরং তাদের আখেরাতের জন্য প্রস্তুত করাও তাদের একটি বড় আমানত। মা-বাবার সঠিক তত্ত্বাবধানই পারে একটি সন্তানকে দুই জাহানের কল্যাণ নিশ্চিত করতে এবং পরকালে আজাব থেকে পরিবারকে রক্ষা করতে।