অক্টোবর ৫, ২০২৬, ০৬:২৭ পিএম
মানুষের জীবনে মা-বাবার পরেই সবচেয়ে গভীর ও স্থায়ী প্রভাব রেখে যান শিক্ষকেরা। সাধারণ পাঠ্যবইয়ের অক্ষরের বাইরে গিয়ে একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর চিন্তাচেতনা, মানবিক চরিত্র এবং ভবিষ্যৎ জীবন গঠনের মূল কারিগর হিসেবে ভূমিকা রাখেন। ইসলাম ধর্মে জ্ঞানার্জনকে যেমন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, তেমনি জ্ঞান বিতরণের মহান কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদেরও দেওয়া হয়েছে অনন্য মর্যাদা। এই কারণে ইসলামী দৃষ্টিকোণে শিক্ষকতা কোনো সাধারণ পেশা নয়, বরং এটি একটি পবিত্র আমানত এবং অত্যন্ত ভারী দায়িত্ব।
পবিত্র কোরআনের প্রথম নাজিল হওয়া বাণী ছিল ইকরা, যার অর্থ পড়ো। সুরা আলাকের প্রথম আয়াতে নির্দেশ এসেছে, পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। এই ঐশী নির্দেশনাই প্রমাণ করে যে ইসলামে বিদ্যার্জনের গুরুত্ব কতটা গভীর ও সার্বজনীন। আর মানুষের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে যারা প্রত্যক্ষ সহায়তা করেন, তাদের অবস্থান সমাজে স্বাভাবিকভাবেই শ্রদ্ধার শীর্ষে। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছেন, যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো পথ বেছে নেয়, মহান আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সুগম করে দেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে সমাজে জ্ঞান দান করা এবং তা অর্জন করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদতের সমতুল্য।
শিক্ষকের প্রতি যথাযথ সম্মান বজায় রাখা ইসলামী শিষ্টাচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলামের সোনালী যুগে সাহাবায়ে কেরাম আলেম ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দিতেন এবং তাদের সামনে অত্যন্ত বিনয় ও একাগ্রতার সাথে শিক্ষা গ্রহণ করতেন। জ্ঞান অর্জনের জন্য শুধু তীক্ষ্ণ মেধার ওপর নির্ভর করলেই চলে না, তার সঙ্গে প্রয়োজন অন্তরের শ্রদ্ধা এবং উত্তম আচরণ।
শিক্ষার্থীদের প্রধান কর্তব্য হলো শিক্ষকের পাঠ মনোযোগ দিয়ে শোনা, অহেতুক বিতর্ক পরিহার করা, শিক্ষকের সময় ও কষ্টের সঠিক মূল্যায়ন করা এবং সংশয় দেখা দিলে শালীনভাবে প্রশ্ন করা। তবে এই সম্মান প্রদর্শনের অর্থ অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং সত্য ও ন্যায়পরায়ণতার সীমার ভেতরে থেকেই শ্রদ্ধার সম্পর্ক রক্ষা করার কথা বলে ইসলাম।
উচ্চ মর্যাদার পাশাপাশি শিক্ষকের কাঁধেও চাপানো হয়েছে বিশাল আমানত ও জবাবদিহিতা। শিক্ষার্থীর সঙ্গে পক্ষপাতহীন ও ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা, সত্য জ্ঞান কখনোই গোপন না রাখা, শিক্ষাদানের দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করা এবং ছাত্রছাত্রীদের উন্নত নৈতিক চরিত্র গঠনে পথপ্রদর্শক হওয়া একজন শিক্ষকের আবশ্যক দায়িত্ব।
বুখারি ও মুসলিম শরিফের নির্ভরযোগ্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। শিক্ষকও তার শিক্ষার্থীদের বিষয়ে এই জবাবদিহিতার আওতাভুক্ত। ফলে শিক্ষকতার প্রতিটি মুহূর্তের সাথে আমানত রক্ষা এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান।
ইসলামের বিধানে উপকারী জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়াকে সদকায়ে জারিয়া বা চিরস্থায়ী পুণ্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সহিহ মুসলিমের আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে তার সব পার্থিব আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, কেবল তিনটি আমলের প্রতিদান অব্যাহত থাকে। এর মধ্যে প্রথমটি সদকায়ে জারিয়া, দ্বিতীয়টি মানুষের উপকারে আসা শিক্ষাদান এবং তৃতীয়টি সৎ সন্তানের নেক দোয়া। একজন শিক্ষক তার জীবদ্দশায় ছাত্রদের মাঝে যে কল্যাণকর জ্ঞান বিলিয়ে যান, পরবর্তী প্রজন্ম সেই জ্ঞানে আলোকিত হলে তার পুণ্যধারা মৃত্যুর পরও বছরের পর বছর চালু থাকে। একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষকের প্রভাব কোনো ক্লাসরুমের চার দেয়ালে আবদ্ধ থাকে না, তা পরিবার ও সমাজের সীমানা পেরিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে বহমান থাকে।
ইসলামে শিক্ষককে মর্যাদা দেওয়া প্রকৃতপক্ষে কোনো একক পেশার প্রতি শ্রদ্ধা নয়, বরং এটি জ্ঞান, শিক্ষা এবং সার্বিক মানবিক মূল্যবোধের প্রতি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীর শ্রদ্ধাবোধ এবং শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকের দায়িত্বশীলতার যৌথ সমন্বয়েই একটি ন্যায়ভিত্তিক, আলোকিত ও জ্ঞাননির্ভর মানবিক সমাজ গড়ে ওঠা সম্ভব।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন