অক্টোবর ১২, ২০২৬, ১০:০৩ এএম
সংকটে মুমিনের করণীয় নির্ধারণে ইসলাম আত্মিক শক্তি অর্জনের পাশাপাশি বাস্তবমুখী পরিকল্পনা ও সুশৃঙ্খল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। মানবজীবনে আর্থিক টানাপোড়েন, ক্ষুধা বা দারিদ্র্য অপ্রত্যাশিতভাবে নেমে আসতে পারে। বৈষয়িক এমন প্রতিকূলতায় মানুষ অনেক সময় তীব্র হতাশায় নিমজ্জিত হয়, যা তাকে নৈতিক স্খলন কিংবা অন্যায়ের অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। একজন মুমিনের আকিদা, পারিবারিক প্রশান্তি এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ যেন কোনো সংকটের মুখে ভেঙে না পড়ে, সেজন্য কোরআন ও হাদিসে বাস্তবসম্মত পথনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহর সাহায্য কামনার প্রধানতম মাধ্যম হলো একাগ্রতার সাথে নামাজ কায়েম করা।
পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ৪৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে তোমরা সাহায্য গ্রহণ করো; নিশ্চয়ই নামাজ একটি কঠিন বিষয়, তবে বিনয়ী ব্যক্তিদের নিকট তা কঠিন নয়। পার্থিব সংকট থেকে উত্তরণে প্রার্থনার পাশাপাশি আত্মসংযম ও সবরের কোনো বিকল্প নেই।
সংকট মুক্তির আরেকটি শক্তিশালী আধ্যাত্মিক হাতিয়ার হলো প্রতিনিয়ত ইস্তেগফার বা ক্ষমাপ্রার্থনা করা।
কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, নবী হুদ (আ.) তার জাতিকে সতর্ক করে বলেছিলেন, তোমরা নিজ প্রতিপালকের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করো এবং তার অভিমুখী হও; তিনি আসমান থেকে তোমাদের জন্য মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং বিদ্যমান শক্তির সাথে আরও শক্তি বৃদ্ধি করবেন, তাই তোমরা অপরাধী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না (সুরা হুদ, আয়াত: ৫২)। তওবা ও আত্মশুদ্ধি মানুষের রিজিকের দুয়ার উন্মোচন করে এবং জাতীয় ও ব্যক্তিগত সামর্থ্য বাড়িয়ে দেয়।
আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি যেকোনো বিপর্যয় মোকাবিলায় দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করা ইসলামের অবিচ্ছেদ্য শিক্ষা।
প্রাচীন মিসরের শাসক রাইয়ান ইবনে ওলিদ যখন সাতটি মোটাতাজা গাভিকে সাতটি শীর্ণ গাভি কর্তৃক খেয়ে ফেলার এবং সাতটি সবুজ ও শুষ্ক শিষের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তখন নবী ইউসুফ (আ.) আসন্ন দুর্ভিক্ষের গভীরতা অনুধাবন করেন। পবিত্র কোরআনের সুরা ইউসুফের ৪৭ ও ৪৮ নম্বর আয়াতে উল্লেখ রয়েছে, ইউসুফ (আ.) বাদশাহকে সাত বছর বিরতিহীন চাষাবাদ করার পরামর্শ দেন। তিনি নির্দেশ দেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামান্য অংশ ছাড়া বাকি ফসল যেন শিষসহ সংরক্ষণ করা হয়, যাতে পরবর্তী সাত বছরের কঠিন দুর্ভিক্ষের দিনে পূর্বসঞ্চিত খাদ্য খেয়ে বাঁচা যায় এবং ভবিষ্যতের জন্য বীজও সংরক্ষিত থাকে।
বৈধ উপায়ে হালাল সম্পদ সঞ্চয় করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার ব্যবস্থা করাও মুমিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সহিহ বুখারির এক হাজার ২৯৫ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর অসুস্থতার সময় নবীজি (সা.) তাকে দেখতে গিয়ে উপদেশ দেন যে, উত্তরসূরিদের নিঃস্ব অবস্থায় মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পাতার মতো অবস্থায় ফেলে যাওয়ার চেয়ে তাদেরকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী রেখে যাওয়াই শ্রেয়।
সম্পদ কেবল ধনীদের মধ্যে কুক্ষিগত থাকলে সমাজে অর্থনৈতিক সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাই সুষম বণ্টনের মাধ্যমে সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
পবিত্র কোরআনের সুরা হাশরের ৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, জনপদবাসীর কাছ থেকে প্রাপ্ত সম্পদ মূলত আল্লাহ, তার রাসুল, নিকটাত্মীয়, এতিম, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরদের প্রাপ্য; যেন ধনীদের মাঝেই কেবল অর্থবিত্তের আবর্তন সীমাবদ্ধ না থাকে। এই ভারসাম্য রক্ষা করা না গেলে সাধারণ মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।
দৈনন্দিন খরচের ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন করা মুমিনের মৌলিক গুণ। অপব্যয় এবং চরম কৃপণতা উভয় স্বভাবকেই ইসলাম পুরোপুরি পরিহার করতে বলেছে। সুরা বনি ইসরাইলের ২৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা নিজ হাতকে গলার সাথে বেঁধে রেখো না (অর্থাৎ অতি কৃপণ হয়ো না), আবার হাতকে সম্পূর্ণরূপে প্রসারিতও করে দিয়ো না (অর্থাৎ অপচয়কারী হয়ো না)।
সংকটকালে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী বা মজুতদারদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য অপরিহার্য।
ইসলামি বিধানে মজুতদারিকে অত্যন্ত গর্হিত ও অভিশপ্ত কাজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সুনানে ইবনে মাজাহর দুই হাজার ১৫৩ নম্বর হাদিসে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিকারী ব্যক্তি রিজিকপ্রাপ্ত হয়, আর পণ্য আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী মজুতদার অভিশপ্ত।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন