অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ১০:২২ পিএম
সুরা ক্বফে জন্ম-মৃত্যু ও পুনরুত্থানের অকাট্য বাস্তবতার পাশাপাশি মানবজীবনের চূড়ান্ত পরিণতির গভীর দিকনির্দেশনা ফুটে উঠেছে। পবিত্র কোরআনে মানুষের সৃষ্টির সূচনা, পৃথিবীতে আগমন, জীবনের সীমাবদ্ধতা, মৃত্যুর অনিবার্যতা এবং মৃত্যুর পরবর্তী পুনরুত্থান ও হিসাব-নিকাশের বিবরণ ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মানবজাতি একসময় সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন ছিল। পরম করুণাময় আল্লাহ তাকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এনেছেন, পৃথিবীতে বসবাসের অবকাশ দিয়েছেন এবং নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্যের সীমারেখা নির্ধারণ করেছেন।
পার্থিব এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের সমাপ্তি ঘটলেও মানুষের অস্তিত্ব চিরতরে বিলীন হয় না। বরং তাকে পুনরায় জীবিত হয়ে মহান আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতে হবে এবং জীবনের প্রতিটি কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে। সুরা মুমিনুনের ১১৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, ‘তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদের অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের আমার কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না?’
রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার খুতবায় নিয়মিত এ সুরা পাঠ করতেন।
উম্মে হিশাম বিনতে হারিসা ইবনুল নুমান (রা.) থেকে সহিহ মুসলিমের ৮৭৩ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র মুখ থেকেই সুরা ক্বফ শিখেছেন। কারণ মহানবী (সা.) প্রতি জুমার দিনে মিম্বরে দাঁড়িয়ে সমবেত মুসল্লিদের উদ্দেশে খুতবা দেওয়ার সময় এই সুরাটি তিলাওয়াত করতেন। পবিত্র এ সুরার ভেতরে মানবজাতির জন্য ছয়টি সুনির্দিষ্ট ও চিরন্তন বার্তা বিশেষভাবে সন্নিবেশিত রয়েছে।
প্রথমত, মহাবিশ্বের সৃষ্টি পুনরুত্থানের বাস্তব প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। বিচ্ছিন্ন আরবি হরফ ‘কাফ’ দিয়ে সুরাটির সূচনা ঘটিয়ে কোরআনের শপথের মাধ্যমে মানুষের গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে। সুরা ক্বফের এক থেকে তিন নম্বর আয়াতে অবিশ্বাসীদের বিস্ময় ও আপত্তির প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছে, কাফিররা বিস্মিত হয়ে বলেছিল যে তাদের মধ্য থেকেই একজন সতর্ককারী এসেছেন এবং মানুষ মরে মাটিতে মিশে যাওয়ার পর কীভাবে পুনরায় জীবিত হওয়া সম্ভব। এর জবাবে মহান আল্লাহ তাঁর সর্বব্যাপী জ্ঞান ও অসীম শক্তির প্রমাণ সামনে এনেছেন। যিনি শূন্য থেকে মানুষকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তাঁর পক্ষে দ্বিতীয়বার পুনরুজ্জীবিত করা কোনোভাবেই অসম্ভব নয়। সুরা ক্বফের নয় থেকে এগারো নম্বর আয়াতে বিস্তৃত আকাশ, নক্ষত্ররাজি, বিশাল পৃথিবী, সুদৃঢ় পর্বতমালা এবং বৃষ্টির পানির মাধ্যমে মৃত শুষ্ক ভূমিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার ও ফলবান খেজুরবাগানের উপমা দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, পুনরুত্থান ঠিক এভাবেই ঘটবে।
দ্বিতীয়ত, অতীতের অবাধ্য জাতিগুলোর মর্মান্তিক পরিণতি থেকে শিক্ষা গ্রহণের নির্দেশনা রয়েছে। সুরা ক্বফের ১২ থেকে ১৪ নম্বর আয়াতে নুহ (আ.)-এর সম্প্রদায়, রাসের অধিবাসী, সামুদ, আদ, ফেরাউন, লুত (আ.)-এর সম্প্রদায়, আইকার অধিবাসী এবং তুব্বার সম্প্রদায়ের সত্য অস্বীকারের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। পার্থিব প্রতাপ ও শক্তির দম্ভ কোনোভাবেই তাদের ঐশী শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারেনি।
তৃতীয়ত, মানুষের অন্তরের অতি গোপন চিন্তাভাবনাও আল্লাহর প্রত্যক্ষ জ্ঞানে সুরক্ষিত। সুরা ক্বফের ১৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার মন তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয়, তা আমি জানি। আর আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনি থেকেও তার অধিক নিকটবর্তী।’ মানুষের অন্তরের সূক্ষ্মতম ইচ্ছা অন্যের কাছে গোপন থাকলেও স্রষ্টার কাছে তা সদাপ্রকাশ্য।
চতুর্থত, মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের কর্মকাণ্ড অবিরত লিপিবদ্ধ হচ্ছে। সুরা ক্বফের ১৭ ও ১৮ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানুষের ডানে ও বামে সার্বক্ষণিক দুজন পর্যবেক্ষক ফেরেশতা উপস্থিত থেকে প্রতিটি উচ্চারিত বাক্য ও কাজ নিখুঁতভাবে নথিভুক্ত করে রাখছেন।
পঞ্চমত, পার্থিব জীবনের সবচেয়ে অমোঘ ও নিশ্চিত বাস্তবতা হলো মৃত্যু। সুরা ক্বফের ১৯ নম্বর আয়াতে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে, ‘মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যসহ উপস্থিত হবে। এ থেকেই তো তুমি পালিয়ে বেড়াতে।’ এরপর শিঙায় ফুঁক দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিশ্রুত কিয়ামতের ময়দানে প্রত্যেক ব্যক্তি একজন চালক ও একজন সাক্ষীর সঙ্গে উপস্থিত হবে বলে ২০ ও ২১ নম্বর আয়াতে ব্যক্ত করা হয়েছে।
ষষ্ঠত, জান্নাত ও জাহান্নামের মাধ্যমে অর্জিত হবে চূড়ান্ত পরিণতি। সুরা ক্বফের ৩১ ও ৩২ নম্বর আয়াতে মুত্তাকি ও আল্লাহমুখী বান্দাদের সম্মানার্থে জান্নাতকে অতি নিকটে উপস্থিত করার এবং প্রতিশ্রুত পুরস্কার অর্পণের দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। মহাবিশ্বের অপার ব্যবস্থাপনা এবং অতীতের সতর্কবার্তা মূলত মানুষের সৃষ্টি যে উদ্দেশ্যহীন নয়, সেই সত্যই সুদৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে বলে জানিয়েছে দিনাজপুর টিভি ডট কম।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন