অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ১০:১৬ এএম
একটি আদর্শ ও সুন্দর সন্তান গড়ে তোলার পরিকল্পনা তার ভূমিষ্ঠ হওয়ার অনেক আগে থেকেই শুরু হওয়া উচিত। পবিত্র কোরআনে উম্মে মারইয়ামের (আ.) মানতের ঘটনা এই বিষয়ে সবচেয়ে অনন্য ও অনুপম দৃষ্টান্ত। তিনি মহান আল্লাহর দরবারে বিনীতভাবে আরজি জানিয়েছিলেন, তিনি তাঁর গর্ভের সন্তানকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর দ্বিনের সেবায় উৎসর্গ করলেন। তাঁর গভীর আকাঙ্ক্ষা ছিল, তাঁর সন্তান একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকবে এবং দ্বিনের কাজে নিবেদিত হবে।
কন্যাসন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তিনি তার নাম রাখেন মারইয়াম এবং নবজাতক ও তার অনাগত বংশধরদের জন্য অভিশপ্ত শয়তানের প্রভাব থেকে আল্লাহর বিশেষ আশ্রয় প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর এই আন্তরিক প্রার্থনা কবুল করেন এবং মারইয়ামকে (আ.) উত্তম ও পবিত্র পরিবেশে প্রতিপালনের ব্যবস্থা করে দেন।
শিশুর কোমল মনে ঈমান ও উন্নত নৈতিকতার স্থায়ী ভিত্তি স্থাপনের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো শৈশব। এই প্রাথমিক বয়সে মায়ের দেওয়া শিক্ষা, ব্যক্তিগত আচরণ এবং সামগ্রিক পারিবারিক পরিবেশ সন্তানের মনোজগতে সবচেয়ে গভীর রেখাপাত করে।
উম্মে সুলাইম (রা.) ইসলাম গ্রহণের পরপরই নিজের ছোট সন্তান আনাসকে (রা.) নিখাদ ঈমানের শিক্ষায় গড়ে তুলতে ব্রতী হন। তিনি একেবারে শিশুকাল থেকেই ছেলেকে কালেমা শেখাতে শুরু করেন। পরবর্তীকালে সেই সন্তান রাসুলুল্লাহর (সা.) অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ খাদেম এবং বিশিষ্ট সাহাবি হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান। সন্তানের এই অনন্য মর্যাদার পেছনে মায়ের নিরবচ্ছিন্ন যত্ন ও গভীর ত্যাগের ভূমিকা ছিল অসামান্য। নিজের প্রতিপালনে মায়ের অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে আনাস (রা.) পরবর্তী জীবনে বলতেন, আল্লাহ যেন তাঁর মাকে সর্বোত্তম প্রতিদান দান করেন, কারণ তিনি তাঁকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রতিপালন করেছিলেন।
সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত করার ক্ষেত্রে পার্থিব বা আর্থিক সচ্ছলতার চেয়ে মায়ের মনের গভীর আন্তরিকতা এবং অটল সংকল্প অনেক বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম সুফিয়ান সাওরির (রহ.) জীবন এর উজ্জ্বল প্রমাণ। চরম অভাব-অনটন সত্ত্বেও তাঁর মা সন্তানের জ্ঞানার্জনের পথে দারিদ্র্যকে বাধা হতে দেননি। তিনি ছেলেকে সুনির্দিষ্টভাবে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, সন্তান যেন একমনে ইলম অর্জন চালিয়ে যায় এবং তিনি নিজে সুতা কেটে কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে সন্তানের যাবতীয় খরচ বহন করবেন। ইমাম শাফেয়ির (রহ.) মা-ও সন্তানের ভবিষ্যতের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন ও দূরদর্শী। কঠিন টানাপোড়েন ও অভাবের মাঝেও তিনি সন্তানের ভবিষ্যৎ গঠনের সুদৃঢ় লক্ষ্য থেকে একচুলও সরে যাননি।
জ্ঞান অর্জনের একমাত্র উদ্দেশ্য শুধুই তথ্য মুখস্থ করা নয়; বরং অর্জিত জ্ঞানের আলোকে নিজের চরিত্র ও বাস্তব জীবনকে সুন্দর করা। এই গভীর সত্যটি ইমাম সুফিয়ান সাওরির (রহ.) মা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি তাঁর ছেলেকে নিয়মিত তাগিদ দিয়ে বলতেন, প্রতি ১০টি হাদিস শেখার পর তার ব্যক্তিগত চালচলন, সহনশীলতা ও ব্যক্তিত্বের গাম্ভীর্যে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে কি না, তা যেন সে নিজেই পরীক্ষা করে দেখে।
একইভাবে ইমাম মালিকের (রহ.) মা যখন তাঁকে প্রখ্যাত আলেম ইমাম রবিয়াতুর রায়ের (রহ.) পাঠশালায় পাঠাতেন, তখন স্পষ্ট উপদেশ দিয়ে বলতেন, তিনি যেন শিক্ষকের কাছ থেকে হাদিস ও ফিকহের মাসআলা শেখার আগে তাঁর অনন্য শিষ্টাচার ও ব্যক্তিগত উন্নত আচরণ আয়ত্ত করেন।
সন্তানের মনস্তত্ত্ব ও চারিত্রিক দৃঢ়তা নির্মাণে তার চারপাশের পরিবেশ, সঙ্গী এবং অনুসরণীয় ব্যক্তিদের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। তাই সচেতন মায়েদের প্রধান কর্তব্য সন্তানকে সবসময় নেককার মানুষের সান্নিধ্যে থাকার অনুপ্রেরণা দেওয়া। বিশিষ্ট সাহাবি হুযাইফা ইবনুল ইয়ামানের (রা.) মা তাঁকে রাসুলুল্লাহর (সা.) দরবারে উপস্থিত হয়ে নিয়মিত তাঁর সাহচর্য লাভে অবহেলা করার কারণে সতর্ক করেছিলেন। মায়ের সেই আন্তরিক তাগিদ পেয়েই তিনি কালবিলম্ব না করে রাসুলুল্লাহর (সা.) পবিত্র সান্নিধ্যে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেন।
সন্তানকে আমানতদার ও বিশ্বাসভাজন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পারিবারিক অনুশাসনের গুরুত্ব অপরিসীম। শৈশবে আনাস (রা.) একবার অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বিশেষ একটি জরুরি কাজে পাঠান। কাজটি সম্পন্ন করে ঘরে ফিরতে দেরি হলে তাঁর মা বিলম্বের কারণ জানতে চান। শিশু আনাস (রা.) জানান, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে একটি গোপন কথা বলেছেন, যা অন্য কারো কাছে প্রকাশ করার অনুমতি নেই। সন্তানের এমন কথা শুনে তাঁর মা অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন এবং রাসুলুল্লাহর (সা.) সেই গোপন কথা আজীবন সুরক্ষিত রাখার কড়া নির্দেশ দেন।
শিশুর চারিত্রিক পরিচ্ছন্নতা ও আত্মিক পবিত্রতা বিকাশে হালাল খাদ্যের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাবেয়ি মুআজা আল-আদাবিয়্যা (রহ.) তাঁর দুধ-সন্তানকে সবসময় হারাম উপার্জন ও খাবার থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে সজাগ করতেন। তিনি সন্তানকে স্মরণ করিয়ে দিতেন, শৈশবে স্তন্যদানের সময় তিনি অত্যন্ত সতর্কতা ও যত্নের সঙ্গে হালাল খাবার গ্রহণ করেছিলেন; তাই পরিণত বয়সেও সন্তানকে প্রতিটি পদক্ষেপে সৎ উপার্জন এবং পবিত্র খাবারের ব্যাপারে কঠোরভাবে যত্নবান হতে হবে। আধুনিক যুগেও এই শিক্ষা সমান প্রাসঙ্গিক এবং প্রতিটি পরিবারে শৈশব থেকেই সততার চর্চা রাখা অপরিহার্য।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন