অক্টোবর ২২, ২০২৫, ১০:৫৪ এএম
মানব অস্তিত্বের এক মৌলিক বাস্তবতা হলো নির্ভরশীলতা। মানুষ হিসেবে আমরা প্রতি মুহূর্তে বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণের জন্য একে অপরের ওপর বা পারিপার্শ্বিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করি। কিন্তু এই সমগ্র সৃষ্টিজগতের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক কে? কে সেই সত্তা যিনি কেবল সৃষ্টিই করেননি, বরং প্রতিটি জিনিসের নিখুঁত তত্ত্বাবধান করছেন? ইসলাম এই মৌলিক প্রশ্নের একটি স্পষ্ট ও যৌক্তিক সমাধান উপস্থাপন করে, যা তাওহীদ বা একত্ববাদ নামে পরিচিত।
পবিত্র কোরআনুল কারিমের অসংখ্য আয়াতে এই একত্ববাদের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে সুরা আনআমের ১০২ নম্বর আয়াতটি অন্যতম। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলার পরিচয়, ক্ষমতা এবং মানুষের প্রতি তাঁর অধিকার অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি। আয়াতে বলা হয়েছে, “তিনিই তো আল্লাহ, তোমাদের রব; তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনিই সবকিছুর স্রষ্টা; কাজেই তোমরা তাঁর ইবাদত কর; তিনি সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক।
” এই একটি আয়াত ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের সব দিককে ধারণ করে।আয়াতের শুরুতেই বলা হয়েছে, “তিনিই তো আল্লাহ, তোমাদের রব।” এখানে ‘রব’ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রব অর্থ কেবল সৃষ্টিকর্তা নয়, বরং তিনি প্রতিপালনকারী, রক্ষণাবেক্ষণকারী, রিজিকদাতা এবং একচ্ছত্র অধিপতি। এই মহাবিশ্বের কোনো কিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণ ও ইচ্ছার বাইরে নয়। আমাদের জীবন, মৃত্যু, স্বাস্থ্য, অসুস্থতা—সবকিছুই সেই মহান রবের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
এই বিশ্বাস মানুষকে অন্য কোনো শক্তির কাছে মাথা নত করা থেকে বিরত রাখে এবং তাকে কেবল এক আল্লাহর প্রতি আস্থাশীল করে তোলে। যখন একজন বিশ্বাসী মেনে নেয় যে তার রব আল্লাহ, তখন সে সৃষ্টির ওপর নয়, স্রষ্টার ওপর নির্ভরশীল হতে শেখে।এর পরের অংশে বলা হয়েছে, “তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই।”
এটি তাওহীদের মূল ভিত্তি, যা তাওহীদ উল-উলুহিয়্যাহ বা উপাসনার একত্ববাদ নামে পরিচিত। ‘ইলাহ’ অর্থ হলো সেই সত্তা, যাঁর উপাসনা করা হয়, যাঁর কাছে চূড়ান্ত আশা ও ভয় নিয়ে দোয়া করা হয়, যাঁর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি বা মানত করা হয়। যেহেতু আল্লাহই একমাত্র রব বা প্রতিপালক, তাই যৌক্তিক দাবি হলো—ইবাদত বা উপাসনাও কেবল তাঁরই প্রাপ্য। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তি, বস্তু, পীর, নবী, ফেরেশতা বা অন্য কোনো শক্তি ইবাদতের যোগ্য নয়।
হৃদয় ও শরীরের সমস্ত বিনম্রতা, দোয়া এবং কেবল সেই এক আল্লাহর জন্যই নিবেদিত হতে হবে।কেন তিনি একমাত্র ইলাহ? এর উত্তর পরের অংশেই দেওয়া হয়েছে: “তিনিই সব কিছুর স্রষ্টা।” এটি আল্লাহর সৃষ্টিশক্তির ঘোষণা, যা তাওহীদুল খালক নামে পরিচিত। এই মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম পরমাণু থেকে শুরু করে সুবিশাল ছায়াপথ পর্যন্ত দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান যা কিছু আছে, তার সবকিছুরই একক স্রষ্টা হলেন আল্লাহ তাআলা।
মানুষকে এটি গভীরভাবে চিন্তা করতে আহ্বান করা হয়েছে যে, যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তো উপাসনার একমাত্র যোগ্য। যাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে, যারা নিজেরাই অন্য আরেকজনের সৃষ্টির অধীন, তারা কখনোই উপাসনার যোগ্য হতে পারে না। এই বিশ্বাস মানুষকে বস্তুবাদিতা এবং শিরক বা অংশীদারিত্বের কলুষতা থেকে মুক্ত করে।যখন এটা প্রমাণিত যে তিনিই একমাত্র রব এবং তিনিই একমাত্র স্রষ্টা, তখন মানুষের করণীয় কী?
আল্লাহ তাআলা সেটিরও নির্দেশ দিচ্ছেন: “সুতরাং তোমরা তাঁর ইবাদত কর।” এটি একটি সুস্পষ্ট আদেশমূলক বাক্য, যা মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়। এখানে ‘ইবাদত’ শব্দটি কেবল নামাজ, রোজা, হজ বা জাকাতের মতো আনুষ্ঠানিক উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশিত বিধান মেনে চলা এবং তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকাই হলো ইবাদত। ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহর আইন মেনে চলার মাধ্যমেই ইবাদতের পূর্ণতা আসে।
আয়াতের শেষে আল্লাহ তাআলা তাঁর আরও একটি গুণের কথা উল্লেখ করে বলেন, “তিনিই সব কিছুর তত্ত্বাবধায়ক।” আরবিতে ‘ওয়াকীল’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ তত্ত্বাবধায়ক, রক্ষণাবেক্ষণকারী বা ফলাফল নির্ধারণকারী। এটি তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহকে পুনরায় নিশ্চিত করে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা শুধু সৃষ্টি করেই ছেড়ে দেননি, বরং তিনি প্রতিটি সৃষ্টির রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। কোনো কিছুই তাঁর জ্ঞানের বাইরে ঘটে না। তিনি কারো ওপর সামান্যতম অন্যায় করেন না, আবার কারো প্রতি দয়া করার জন্য তাঁকে কারো অনুমতির প্রয়োজন হয় না।
এই বিশ্বাস একজন মুমিনকে তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করার শিক্ষা দেয়। জীবনের সাফল্য, ব্যর্থতা, রিজিক বা বিপদ—সবকিছুই যে আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে, এই গভীর প্রত্যয় মানুষকে মানসিক প্রশান্তি দান করে। সে তখন বিপদে ধৈর্য ধারণ করে এবং সুখে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, কারণ সে জানে তার সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক স্বয়ং আল্লাহ তাআলা।





দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন