শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬,

শেষ জামানার ফিতনা: ঈমান রক্ষায় করণীয়

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২৪, ২০২৫, ১০:৪১ এএম

শেষ জামানার ফিতনা: ঈমান রক্ষায় করণীয়

ছবি - সংগৃহীত

ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, পৃথিবী তার পরিসমাপ্তি বা কেয়ামতের দিকে যতই এগিয়ে যাবে, ততই পৃথিবীতে নানামুখী ফিতনা বা পরীক্ষা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বিভিন্ন হাদিসে এ বিষয়ে উম্মতকে সুস্পষ্টভাবে সতর্ক করে গেছেন। তিনি জানিয়েছেন, শেষ জামানায় ফিতনা এতটাই ব্যাপক ও সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করবে যে, সেই ফিতনার ভয়াবহ সয়লাবের মধ্যে একজন মুমিনের জন্য তার ঈমান বা বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

সেই ফিতনাগুলো আসবে কখনও অবিরাম বৃষ্টির ফোঁটার মতো অগণিত ধারায়, আবার কখনও তা অন্ধকার রাতের মতো গভীর ও বিভৎস রূপ নিয়ে। মানুষ একটি ফিতনা থেকে কোনোভাবে রক্ষা পেলেও পরক্ষণেই নতুন আরেকটি ফিতনা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরবে, তাকে পর্যুদস্ত করার চেষ্টা করবে। এই কঠিন বাস্তবতায়, নিজের ঈমান বা বিশ্বাসকে সুরক্ষিত রাখার স্বার্থেই কেয়ামত-পূর্ব সময়ের এই সর্বগ্রাসী ফিতনাগুলো সম্পর্কে জানা এবং সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রত্যেক মুমিনের অপরিহার্য কর্তব্য।

শেষ জামানার ভয়াবহ ফিতনা সম্পর্কে উম্মতকে আগেভাগেই সতর্ক করতে গিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, অন্ধকার রাতের মতো একের পর এক ফিতনার আগমনের পূর্বেই তোমরা সৎকাজ করার প্রতি দ্রুত অগ্রসর হও। কারণ সেই সময়ে এমন অবস্থা হবে যে, যে ব্যক্তি সকালে নিজেকে মুমিন বা বিশ্বাসী হিসেবে পাবে, সন্ধ্যায় সে কাফের বা অবিশ্বাসী হয়ে যাবে। আবার যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় মুমিন থাকবে, সে সকালে কাফের হয়ে যাবে। মানুষ তখন দুনিয়ার সামান্য ও তুচ্ছ স্বার্থ হাসিলের জন্য অবলীলায় তার অমূল্য দ্বীন বা ধর্মকে বিক্রি করে দেবে।

(সহীহ মুসলিম)। এই হাদিসটি শেষ জামানার ঈমানহরণকারী পরিস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। পার্থিব লোভ-লালসা, সামাজিক চাপ এবং ভ্রান্ত মতবাদের প্রবল স্রোতে মানুষের ঈমানের ভিত কতটা নড়বড়ে হয়ে যাবে, তা সহজেই অনুমেয়। রাসূল (সা.) আরেকটি হাদিসে এই কঠিন সময়ের রূপ আরও স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেছেন, তোমাদের পরে এমন একটি যুগ আসবে, যখন সেই সময়ে (ইসলামের ওপর) ধৈর্য ধরে থাকাটা হাতের মুঠোয় জ্বলন্ত অঙ্গার ধারণ করে রাখার মতোই (কষ্টকর ও যন্ত্রণাদায়ক) হবে।

কিন্তু সেই কঠিন সময়েও যারা ঈমানের ওপর দৃঢ় থেকে ইসলামের বিধান অনুযায়ী আমল করবে, তাদের একজনের প্রতিদান হবে তোমাদের সময়ের পঞ্চাশজন আমলকারীর প্রতিদানের সমান। (জামে তিরমিজি)। এই হাদিসটি একদিকে যেমন কেয়ামত-পূর্ব সময়ের ভয়াবহতা ও ঈমান ধরে রাখার চরম কষ্টকর অবস্থার কথা জানায়, তেমনি অন্যদিকে সেই ভয়াবহ সময়েও যারা ঈমানের ওপর পর্বতসম অবিচল থাকবে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর পক্ষ থেকে অভাবনীয় পুরস্কারের সুসংবাদও বহন করে।

বর্তমান সময়ের দিকে তাকালে এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার বিচার করলে মনে হয়, হাদিসে বর্ণিত ফিতনাসংকুল সেই ভয়ংকর যুগে আমরা হয়তো ইতোমধ্যেই প্রবেশ করে ফেলেছি। একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলেই দেখা যায়, আমাদের পরিবারে, কর্মস্থলে, সমাজে, রাস্তায়, হাটে-বাজারে, এমনকি আমাদের হাতে থাকা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে—সর্বত্রই যেন ফিতনার অবাধ বিচরণ ও হাতছানি। অবিরাম বর্ষণরত বৃষ্টির মতোই নানামুখী ফিতনা আমাদের ওপর আছড়ে পড়ছে।

এই ফিতনার প্রবল স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমাদের ঈমানকে ধরে রাখা প্রতিনিয়ত অত্যন্ত কঠিন এক সংগ্রামে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, পরিস্থিতি এতটা নাজুক হওয়া সত্ত্বেও আমরা যেন ততটা সতর্ক হচ্ছি না, যতটা সতর্কতা অবলম্বন করা আমাদের জন্য অপরিহার্য ছিল। অথচ রাসূল (সা.)-এর সাহাবাগণ (রা.) যখন প্রিয় নবীর মুখে ফিতনার ভয়াবহতার বর্ণনা শুনতেন, তখন তারা নিজেদের ঈমানের পরিণতি নিয়ে অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে পড়তেন এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।

বর্তমানে ফিতনা এমন এক সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে যে, অমুসলিম দেশগুলোর কথা বাদ দিলেও, মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতেও পরিপূর্ণভাবে ইসলাম মেনে চলা বা ঈমান নিয়ে টিকে থাকাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। সমাজের যেসকল মানুষ ঈমানের ব্যাপারে সোচ্চার, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর বাতলে দেওয়া পথে চলতে যারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও আপোসহীন, তাদেরকে পথেঘাটে, সমাজে, এমনকি কখনো কখনো পরিবারেও নানা ধরনের টিপ্পনী ও বাধার সম্মুখীন হতে হয়।

প্রায়শই শুনতে হয়—‘আজকাল এত বাছবিচার করে কি আর চলা যায়?’ সমাজের চোখে এই ধর্মপ্রাণ মানুষগুলোকে ‘সেকেলে’, ‘অসামাজিক’, ‘গোঁড়া’, ‘আনস্মার্ট’ ইত্যাদি নানা নেতিবাচক বিশেষণে পরিচিত করানোর একটি অপপ্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। কেউ যদি সুদের কারবার বা হারাম উপার্জনের কোনো পেশায় যুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানায়, অনেক সময় দেখা যায় তার নিজের মা-বাবা পর্যন্ত তাকে ভর্ৎসনা করছেন। একজন যুবক যদি নবীর সুন্নত হিসেবে দাড়ি রাখতে চায়, তাকেও পরিবার ও সমাজ থেকে নানা ধরনের কটুকথা শুনতে হয়, চাকরির বাজারে বাধার সম্মুখীন হতে হয়।

সমাজের এসব নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, অবহেলা আর অব্যাহত কটুকথার মুখে পড়ে অনেক মানুষই একটা সময় হাল ছেড়ে দেয় এবং স্রোতের তালে গা ভাসিয়ে দেয়। তারা আপোস করে ভাবতে শুরু করে, এই আধুনিক যুগে হয়তো সাড়ে চৌদ্দ শ বছর আগে নাজিল হওয়া ইসলামের প্রতিটি বিধান অক্ষরে অক্ষরে পালন করা আসলেই সম্ভব নয়। এসবই হলো সমাজে নীরবে ছড়িয়ে পড়া নানামুখী ফিতনার একেকটি বাস্তব নমুনা, যা ধীরে ধীরে মানুষকে তার ঈমান ও আদর্শ থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে।

ইসলামের বিধান পালনের ক্ষেত্রে এই ধরনের প্রতিবন্ধকতা এবং ধর্ম পালনকারীদের সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার দৃশ্য দেখলে রাসূল (সা.)-এর আরেকটি হাদিসের কথা স্মরণ হয়। তিনি বলেছেন, ‘ইসলামের সূচনা হয়েছিল অত্যন্ত অপরিচিত বা দুর্বল অবস্থায়, এবং অচিরেই সে আবার তার সূচনাকালের মতো অপরিচিত বা দুর্বল অবস্থায় ফিরে যাবে। সুতরাং সেই অপরিচিতদের (যারা সেই কঠিন সময়েও ইসলামকে আঁকড়ে ধরে থাকবে) জন্য রয়েছে সুসংবাদ।’ (সহীহ মুসলিম)। মক্কায় যখন ইসলামের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তখন ইসলাম ছিল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের ধর্ম, সমাজের চোখে অপরিচিত ও দুর্বল।

সময়ের পরিক্রমায় ইসলাম শক্তি অর্জন করেছে, এর আলো বিশ্বময় ছড়িয়েছে, জৌলুশ ও ঐশ্বর্য বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু কেয়ামতের আগে ইসলাম আবার তার সেই সূচনাকালের অবস্থায় ফিরে যাবে। অর্থাৎ, কেয়ামত-পূর্ব ভয়াবহ ফিতনার সময়ে মানুষ ইসলাম পালনকে একটি বোঝা মনে করবে, ইসলাম পালনকারীরা সমাজের সর্বত্র কোণঠাসা ও সংখ্যালঘু হয়ে থাকবে। আর ঠিক সেই কঠিন সময়ে যারা শত বাধা ও প্রতিকূলতার মাঝেও ইসলামের ওপর দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকবে, তাদের জন্যই আল্লাহর রাসূল (সা.) সুসংবাদ বা জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

কিন্তু এই ফিতনা আসলে কী? ফিতনা মূলত এক ধরনের ধোঁয়াশা, মরীচিকা বা মায়াজাল, যা আমাদের সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে বাধা দেয়, আমাদের ধোঁকার মধ্যে ফেলে দেয়। যার বাহ্যিক রূপ হয়তো খুব আকর্ষণীয় বা সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরের রূপ বা পরিণতি হয় ভয়াবহ ও ঈমান বিধ্বংসী। এসবই ফিতনা।

স্বয়ং আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আর তোমরা জেনে রাখ যে, তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি নিঃসন্দেহে ফিতনা (বা তোমাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ)।’ (সূরা আনফাল, আয়াত ২৮)। ধনসম্পদ যে আমাদের জন্য একটি বড় পরীক্ষা, তা আমরা কমবেশি সবাই বুঝি। কারণ সম্পদের লোভ মানুষকে সহজেই হারাম পথে টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু সন্তান কীভাবে ফিতনা হতে পারে, সে সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ধারণা অস্পষ্ট।

মূলত, সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বা  সুখ নিশ্চিত করার জন্য অনেক বাবা-মা হালাল-হারামের তোয়াক্কা করেন না। সন্তানদের বিলাসবহুল জীবন দিতে গিয়ে তারা ঘুষ, দুর্নীতি, হারাম উপার্জন থেকে শুরু করে এমন অনেক কাজে জড়িয়ে পড়েন, যা সরাসরি ঈমানের পরিপন্থি। আবার কখনো এমনও হয় যে, বাবা-মায়ের চরম অবহেলা বা ভুল নির্দেশনার কারণে সন্তান দ্বীনবিমুখ, বস্তুবাদী ও ভোগবাদী এক মানুষে পরিণত হয়। তখন সন্তানের এই বিচ্যুতির পরোক্ষ দায়ভার বাবা-মায়ের ঘাড়েই পতিত হয়।

এটাও এক ভয়াবহ ফিতনা। তাই, কেয়ামত-পূর্ব এই ভয়াবহ ফিতনার যুগে নিজের এবং পরিবারের ঈমান রক্ষা করতে হলে পবিত্র কোরআন ও সহীহ হাদিস গভীরভাবে অধ্যয়ন করা, সেগুলো সঠিকভাবে বোঝা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করার কোনো বিকল্প নেই।