বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬,

রাজনীতির দুষ্টচক্রেই আটকে থাকল বাংলাদেশের ক্রিকেট

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

এপ্রিল ৮, ২০২৬, ১০:৩৩ এএম

রাজনীতির দুষ্টচক্রেই আটকে থাকল বাংলাদেশের ক্রিকেট

বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে ক্রীড়াঙ্গনেও পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। দেশের সবচেয়ে ধনী ও প্রভাবশালী ক্রীড়া সংস্থা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিবি আবারও সেই পুরনো রাজনীতির দুষ্টচক্রেই আটকা পড়ল। গতকাল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বা এনএসসি কর্তৃক বিসিবির নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার মধ্য দিয়ে এই নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। 

পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার পরপরই জাতীয় দলের সাবেক সফল অধিনায়ক তামিম ইকবালকে প্রধান করে ১১ সদস্যের একটি শক্তিশালী অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির কাঁধেই এখন আগামী তিন মাসের মধ্যে বিসিবির নতুন ও স্বচ্ছ নির্বাচন আয়োজন করার দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছে।

নবগঠিত এই অ্যাডহক কমিটির গঠন নিয়ে ক্রীড়া মহলে এরই মধ্যে আলোচনার ঝড় উঠেছে। ১১ সদস্যের এই কমিটিতে সাবেক ক্রিকেটারদের পাশাপাশি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। 

কমিটির প্রধান হিসেবে তামিম ইকবাল দায়িত্ব পেলেও অন্য সদস্যদের মধ্যে আছেন বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সন্তান ও নিকটাত্মীয়রা। এদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী দলের সংসদ সদস্য ববি হাজ্জাজের স্ত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাশনা ইমাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের ছেলে মির্জা ইয়াসির আব্বাস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলে সাঈদ ইব্রাহিম আহমদ এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে ইসরাফিল খসরু স্থান পেয়েছেন। এ ছাড়া সাবেক অধিনায়ক মিনহাজুল আবেদীন ও ধারাভাষ্যকার আতহার আলী খানের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেট ব্যক্তিত্বদেরও কমিটিতে রাখা হয়েছে।

বিসিবির নির্বাচিত বোর্ড ভেঙে দেওয়ার পেছনে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ একটি দীর্ঘ তদন্ত প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেছে। এনএসসির পরিচালক বা ক্রীড়া প্রধান আমিনুল এহসান জানিয়েছেন যে গত ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বিসিবি নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নির্বাচনে অবৈধভাবে হস্তক্ষেপ করেছিলেন। 

ই-ভোটিং প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার কাউন্সিলর মনোনয়নে ব্যাপক দুর্নীতির প্রমাণ মেলায় ২০১৮ সালের জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ নীতিমালার ২১ ধারা অনুযায়ী বোর্ড বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।এদিকে বোর্ড ভেঙে দেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না বিদায়ী সভাপতি ও সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম। গত রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তিনি নিজেকে এখনো বিসিবির একমাত্র ‘বৈধ সভাপতি’ দাবি করেছেন। 

তিনি বর্তমান এই পরিবর্তনকে একটি ‘সাংবিধানিক অভ্যুত্থান’ হিসেবে অভিহিত করে আইসিসির কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়েছেন। আমিনুল ইসলামের দাবি অনুযায়ী জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের এই তদন্ত রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এটি আইসিসির বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন। কারণ আইসিসি কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ডে সরকারি হস্তক্ষেপ অনুমোদন করে না। তিনি আরও জানিয়েছেন যে ন্যায়বিচারের জন্য তাঁর বোর্ডের সদস্যরা আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন।

ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি এই পরিস্থিতিতে কী অবস্থান নেয় সেটিই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। এর আগে ২০০১ সালে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে বাফুফে নিষিদ্ধ হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রয়েছে। তবে এনএসসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তারা ইতিমধ্যে আইসিসিকে পুরো বিষয়টি অবহিত করেছে এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা প্রমাণের দালিলিক প্রমাণাদি সেখানে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করেছেন যে এই বোর্ড ভাঙার প্রক্রিয়াটি আইসিসির মাধ্যমে বৈধ করতে লন্ডনে লবিং চালানো হচ্ছে যাতে কোনো নিষেধাজ্ঞা না আসে।

গতকাল বিকেলেই তামিম ইকবাল বিসিবি কার্যালয়ে গিয়ে সভাপতির দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানিয়েছেন যে দেশের ক্রিকেটের হারানো সুনাম ফিরিয়ে আনাই হবে তাঁর কমিটির প্রধান কাজ। ব্যক্তিগতভাবে তিনি পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। তামিম মনে করেন একটি বিতর্কমুক্ত নির্বাচন আয়োজন করতে পারলেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। তবে বিদায়ী সভাপতির আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা এবং আইসিসির সম্ভাব্য নজরদারির কারণে দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ যে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল তা বলাই বাহুল্য। মাঠের খেলার চেয়ে এখন আবারও মিরপুরের বিসিবি কার্যালয়ের ক্ষমতার লড়াই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।