বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬,

সুপার এল নিনো ২০২৬ বাংলাদেশের জন্য কতটা উদ্বেগের?

রাকিবুল হাসান মুন্না

জুন ৬, ২০২৬, ০২:৪১ পিএম

সুপার এল নিনো ২০২৬ বাংলাদেশের জন্য কতটা উদ্বেগের?

রাজশাহীর গোদাগাড়ীর কৃষক রহিম মিয়ার চোখে এখন দুশ্চিন্তার ভার। জুন মাসের খরতপ্ত দুপুরে আকাশপানে চেয়ে মেঘ খুঁজছেন তিনি। বরেন্দ্র অঞ্চলের এই মাটিতে আমন ধান রোপণের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা থাকলেও বৃষ্টির দেখা নেই। রহিম মিয়ার ভাষায়, আগে এই সময়ে আকাশ কালো হয়ে বৃষ্টি নামত, কিন্তু এখন শুধু কড়া রোদ আর বাতাস।

প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে গড়ে ওঠা দানবীয় আবহাওয়া পরিস্থিতি সুপার এল নিনো বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য অশনি সঙ্কেত।এল নিনো মূলত একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যা প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর ফিরে আসে। 

প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পশ্চিমা বায়ু উষ্ণ জলরাশিকে এশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়, কিন্তু এল নিনো পর্যায়ে এই বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে মধ্য মহাসাগর থেকে উষ্ণ জলরাশি উল্টো দিকে আমেরিকা মহাদেশের দিকে প্রবাহিত হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়, যা বৈশ্বিক আবহাওয়ার ভারসাম্য নষ্ট করে।

সুপার এল নিনো সাধারণ এল নিনোর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক।যখন প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বৃদ্ধি পায়, তখন তাকে সুপার এল নিনো বলা হয়। ২০২৬ সালের সম্ভাব্য এল নিনোর ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা তাপমাত্রা রেকর্ড ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করছেন। ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এই আবহাওয়া ঘটনাটি বিশ্বকে এক চরম সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। দেড়শ বছর আগের তুলনায় পৃথিবী এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উত্তপ্ত।

২০২৬ সালের পরিস্থিতি তাই আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এবং নাসা ২০২৬ সালকে ঘিরে উচ্চ সতর্কবার্তা জারি করেছে। মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে এল নিনো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ এবং বছরের শেষ ভাগে তা ৯০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব একে জরুরি জলবায়ু সতর্কবার্তা হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, উষ্ণ বিশ্বের আগুনে এল নিনো আরও তেল ঢালবে। দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতে মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ায় বৃষ্টিপাত আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সুপার এল নিনোর প্রভাব হবে বিশ্বজুড়ে।বাংলাদেশে এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে তাপপ্রবাহের সময়কাল ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাবে এবং তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগে বছরে দুই-তিনটি তাপপ্রবাহ হলেও তা এখন পাঁচ-ছয়বার বা তারও বেশি হতে পারে। এছাড়া বৃষ্টিপাতের অভাবে আমন রোপণ ব্যাহত হওয়া, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো সমস্যাগুলো প্রকট হবে। জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনোর ধ্বংসলীলাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই সংকট মোকাবিলায় আমাদের এখনই প্রস্তুতি প্রয়োজন। কৃষি গবেষকরা খরা-সহনশীল ধানের জাত এবং স্বল্প মেয়াদি ফসল চাষের ওপর জোর দিচ্ছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, খাল খনন এবং শহরে গাছ লাগানোর মতো উদ্যোগগুলো এখন সময়ের দাবি।

সুপার এল নিনো কেবল একটি বৈজ্ঞানিক পরিভাষা নয়। এটি আমাদের কৃষকের কান্না, তপ্ত রোদে পুড়ে চলা শ্রমিকের ঘাম আর উপকূলের মানুষের লবণাক্ত জীবনের গল্প। প্রকৃতিকে অস্থির করে তোলার ফল আমরা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। তবে সঠিক বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা আর সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা হয়তো দুর্যোগের এই ধাক্কা সামাল দিতে পারব।সঠিক প্রস্তুতিই রহিম মিয়ার মাঠকে আবার সবুজে ফিরিয়ে আনতে পারে।