বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬,

বৈশাখের রঙে টিকে আছে ঠাকুরগাঁওয়ের মৃৎশিল্প

রবিউল এহ্সান রিপন

এপ্রিল ১৩, ২০২৬, ০৪:০৭ পিএম

বৈশাখের রঙে টিকে আছে ঠাকুরগাঁওয়ের মৃৎশিল্প

ছবি-দিনাজপুর টিভি

মাটির ছোঁয়ায় জীবনের গল্প বুনে চলেন তারা। নিপুণ কারুকাজ আর রঙের মায়ায় প্রতিটি মাটির সামগ্রী যেন আজও বলে যায় বাংলার শেকড়ের কথা। পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে ঠাকুরগাঁওয়ের কুমারপাড়াগুলোতে এখন ব্যস্ততার উৎসব চলছে। বছরের বাকি সময়টা চরম অনিশ্চয়তায় কাটলেও বৈশাখের রঙে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন হারিয়ে যাওয়া এই শিল্পের কারিগররা। 

মূলত একটিমাত্র উৎসবকে কেন্দ্র করেই এখন কোনোমতে টিকে আছে জেলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প।ঠাকুরগাঁও সদরের আকচা ইউনিয়নের পালপাড়া গ্রামের প্রবীণ মৃৎশিল্পী কেরকেরু পাল। বয়স ষাট পেরিয়ে গেলেও ছোটবেলা থেকে মাটির সঙ্গে যে সখ্য গড়ে তুলেছিলেন, তা আজও অটুট। বংশ পরম্পরায় তিনি এই পেশাকে ধরে রেখেছেন। 

বর্তমানে শারীরিক অসুস্থতা আর বয়সের ভারে আগের মতো কাজ করতে না পারলেও মাটির মায়া ছাড়তে পারেননি তিনি। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় মাটির জিনিসের চাহিদা কমে যাওয়ায় কেরকেরু পালের মনে এখন দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। 

তিনি জানান, আগের মতো লাভ না থাকায় তার সন্তানদের এই পেশায় একদমই আগ্রহ নেই। তারা এখন মেকানিক বা অন্যান্য শহরকেন্দ্রিক কাজকে বেছে নিচ্ছে।বর্তমান সময়ের জীবনযাত্রায় প্লাস্টিক ও স্টিলের তৈজসপত্র মানুষের ঘর দখল করে নিয়েছে। এই অসম প্রতিযোগিতায় পাল্লা দিতে না পেরে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। তবে পহেলা বৈশাখ এলেই যেন এই শিল্পে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার হয়। 

ঠাকুরগাঁওয়ের পালপাড়াগুলোতে বর্তমানে তৈরি হচ্ছে বাহারি রঙের হাঁড়ি, পাতিল, ফুলদানি, শোপিস ও শিশুদের হরেক রকমের মাটির খেলনা। লাল, সাদা ও হলুদ রঙের আঁচড়ে এসব পণ্যে বৈশাখী আবহ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন শিল্পীরা। কিন্তু পরিশ্রমের তুলনায় আয় অত্যন্ত কম হওয়ায় এই কারিগরদের জীবন কাটছে অনেক কষ্টে।মৃৎশিল্পী সুবল পালের কণ্ঠেও শোনা গেল একই হতাশার সুর। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশের অন্যান্য কুটির শিল্পের জন্য সরকারি সহায়তা থাকলেও মৃৎশিল্পীদের খবর কেউ নেয় না। কাঁচামাল ও রঙের দাম বাড়লেও বাজারে পণ্যের ন্যায্য মূল্য মিলছে না। 

আগে সারা বছর মাটির জিনিসের চাহিদা থাকলেও এখন শুধুমাত্র বৈশাখী মেলার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে হচ্ছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে এই প্রাচীন শিল্প অচিরেই জাদুঘরে ঠাঁই নেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।অবশ্য শিল্পীদের এই দুরাবস্থার বিষয়ে আশার কথা শুনিয়েছেন ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক। তিনি জানান, মৃৎশিল্প আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। 

একে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় সহায়তা নিয়ে শিল্পীদের পাশে দাঁড়াবে জেলা প্রশাসন। সচেতন মহলের প্রত্যাশা, বৈশাখের এই রঙ যেন কেবল উৎসবকেন্দ্রিক না হয়ে সারা বছর মৃৎশিল্পীদের মুখে হাসি ধরে রাখতে পারে। একমাত্র সরকারি ও বেসরকারি সম্মিলিত উদ্যোগই পারে বাংলার এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে।