এপ্রিল ১৬, ২০২৬, ০৯:২২ পিএম
ভালোবাসা যে কেবল কথার মালায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চরম ত্যাগের মাধ্যমেও প্রমাণ করা যায়, তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন শরীয়তপুরের জসিম উদ্দিন। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের সঙ্গী মিনারা বেগমের প্রাণ বাঁচাতে নিজের একটি কিডনি দান করেছেন তিনি। জীবনসঙ্গিনীর সংকটাপন্ন অবস্থায় জসিমের এই সাহসী সিদ্ধান্ত ও মানবিকতা এখন শরীয়তপুর জেলাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
অনেকেই এই ঘটনাকে আধুনিক সময়ে ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের এক বিরল উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করছেন।পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে ৩২ বছর বয়সী মিনারা বেগম উচ্চ রক্তচাপসহ নানা শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হন।
চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর জানা যায়, তার দুটি কিডনিই বিকল হয়ে গেছে। একই সঙ্গে তার পেটের ভেতরে একটি টিউমারও ধরা পড়ে। এমন খবরে পরিবারটিতে ঘোর অন্ধকার নেমে আসে। মিনারাকে দ্রুত ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখানে তার টিউমারের চিকিৎসা সম্পন্ন হয়।
তবে বিশাল অর্থ সংকটের কারণে কিডনি প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া থমকে যায়। জসিম উদ্দিন তার সাধ্যমতো চেষ্টা করেও কোনো ডোনার খুঁজে পাচ্ছিলেন না।একপর্যায়ে মিনারা বেগমের মা নিজের একটি কিডনি দিতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার হার্টে বড় ধরনের সমস্যা ধরা পড়ায় চিকিৎসকরা কিডনি নেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে জসিম উদ্দিন তখন দিশেহারা হয়ে পড়েন।
ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে তিনি নিজেই নিজের কিডনি দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। কোনো দ্বিধা না করে তিনি চিকিৎসকদের জানান যে, তিনি তার স্ত্রীর পাশে দাঁড়াতে চান। প্রয়োজনীয় সব আইনি ও চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রক্রিয়া শেষে গত ৫ মার্চ ঢাকার শ্যামলী সিকেডি আ্যন্ড ইউরোলজি হাসপাতালে তাদের সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।বর্তমানে মিনারা বেগম তার স্বামীর দেওয়া কিডনি নিয়ে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। সফল অস্ত্রোপচারের পর এই দম্পতি এখন ঢাকার শ্যামলীতে একটি ভাড়া বাসায় থেকে চিকিৎসকদের নিয়মিত তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।
২০০৭ সালে পারিবারিকভাবে বিয়ে হওয়া এই দম্পতির ঘরে তামিম আল মারুফ নামে নবম শ্রেণি পড়ুয়া একটি ছেলে রয়েছে। চাকরির সুবাদে জসিম উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় বসবাস করলেও তার শিকড় শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কুচাইপট্টি ইউনিয়নের বসকাঠি গ্রামে। ২০২৪ সালের শুরু থেকে মিনারার অসুস্থতা বাড়লে তাদের সাজানো সংসারে বড় ঝড় এসেছিল, যা এখন ত্যাগের মহিমায় শান্ত হয়েছে।
নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে মিনারা বেগম জানান, অসুস্থতার খবর শোনার পর থেকে তারা চরম দুশ্চিন্তায় ছিলেন। একদিকে স্বামীর অল্প আয়ের চাকরি, অন্যদিকে সন্তানের পড়াশোনা—সব মিলিয়ে ভবিষ্যৎ অন্ধকার মনে হচ্ছিল। মিনারা আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন যে, যখন তার মায়ের কিডনি দেওয়া সম্ভব হলো না, তখন জসিম তাকে বলেছিলেন, বাঁচলে তারা একসঙ্গেই বাঁচবেন, আর মরলে একসঙ্গেই মরবেন। স্বামীর এই অসামান্য আত্মত্যাগের কারণে নিজেকে পৃথিবীর অন্যতম ভাগ্যবতী মনে করছেন তিনি।
অন্যদিকে জসিম উদ্দিন জানান, এটি সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল। স্ত্রীর কঠিন সময়ে কী করবেন তা ভেবে না পেয়ে তিনি নিজের ইচ্ছাতেই কিডনি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার মতে, স্ত্রীকে সুস্থ দেখতে পাওয়ার আনন্দ সব কষ্টের চেয়ে বড়। জসিমের এই মহানুভবতার প্রশংসা করেছেন কুচাইপট্টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএম নাসির উদ্দিন স্বপনও। তিনি জানান, জসিম উদ্দিন ভালোবাসার যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা বর্তমান সমাজে বিরল। এই দম্পতির সুস্থ ও সুন্দর জীবনের জন্য তিনি সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন