অক্টোবর ১২, ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম
রংপুরে দুর্গাপূজা উদযাপনে জেলা ও মহানগর মিলিয়ে মোট ৯৬৪টি মণ্ডপে পুরোদমে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান এই ধর্মীয় উৎসব নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ রাখতে গোটা এলাকায় চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
প্রশাসন ও মন্দির কমিটির যৌথ উদ্যোগে উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করতে সার্বিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর মহানগরীর ৩৩টি ওয়ার্ডে এবার ১৬৪টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন চলছে। গত বছরের তুলনায় মহানগরীতে মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ১০টি।
জেলার আটটি উপজেলায় মোট ৮০০টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রংপুর সদরে ৯৪টি, গঙ্গাচড়ায় ৯৯টি, তারাগঞ্জে ১৬৫টি, বদরগঞ্জে ১২৫টি, মিঠাপুকুরে ১৫১টি, পীরগঞ্জে ১০০টি, পীরগাছায় ৯১টি এবং কাউনিয়ায় ৭৫টি মণ্ডপে দুর্গোৎসব আয়োজিত হচ্ছে।
সরকারি সহায়তা হিসেবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে জেলার প্রতিটি পূজামণ্ডপের জন্য ৬০০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে উৎসব শুরুর আগেই এই খাদ্যসহায়তা সংশ্লিষ্ট মণ্ডপ কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হবে।
বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মণ্ডপগুলোতে প্রতিমা তৈরি ও সাজসজ্জার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। শিল্পীরা খড়, বাঁশ, সুতলি ও কাদা-মাটি দিয়ে কাঠামো তৈরির পর তুলির রঙে ফুটিয়ে তুলছেন দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও অসুরের প্রতিমা। কোনো কোনো মণ্ডপে চলছে অলংকার পরানো ও মণ্ডপ সজ্জার কাজ।
তবে উপকরণের উচ্চমূল্য, আর্থিক সংকট এবং স্থানীয় দক্ষ কারিগরের ঘাটতি থাকায় বহু মণ্ডপ কর্তৃপক্ষ পার্শ্ববর্তী লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলা থেকে প্রতিমা সংগ্রহ করেছে। কারিগরদের মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিমা সেট তৈরিতে প্রায় এক থেকে দেড় মাস সময় লাগে।
কাউনিয়ার নিলাম খরিদা সদরা সার্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গা মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক শ্রী রজত চন্দ্র রায় জানান, তাদের মন্দিরে প্রতিমা নির্মাণ ও আলোকসজ্জার কাজ প্রায় শেষ। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা বজায় রেখে ধর্মীয় আচার পালনে তারা সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের রংপুর মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রশান্ত কুমার রায় বলেন, গতবারের চেয়ে মণ্ডপ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। পূজার দিনগুলোতে আচারের পাশাপাশি ভক্তিমূলক সংগীতানুষ্ঠান, বস্ত্র বিতরণ, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আরতি প্রতিযোগিতা ও বিজয়া শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।
রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব পলাশ কান্তি নাগ জানান, ঝুঁকিপূর্ণ মন্দিরগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত বিশেষ নজরদারি বাড়ানো দরকার। এছাড়া প্রতিটি মণ্ডপে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভ্রাম্যমাণ টহল এবং সম্প্রীতি রক্ষায় নিরপেক্ষ অবস্থান নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তিনি।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের জেলা সভাপতি রাম জীবন কুণ্ডু জানান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও সব সম্প্রদায়ের মানুষের সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণভাবেই উৎসব সম্পন্ন হবে।
নিরাপত্তা প্রসঙ্গে রংপুর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, উৎসব নির্বিঘ্ন করতে চার স্তরের কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। পূজা শুরুর আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে মোতায়েন থাকবে। মণ্ডপ কমিটির নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি পুলিশ সার্বক্ষণিক তৎপর থাকবে। সবাই মিলে সচেতন থাকলে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটবে না।
রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু বলেন, মণ্ডপ কমিটির নেতাদের সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকতে হবে। প্রতিটি মণ্ডপে সিসি ক্যামেরা চালু রাখা জরুরি, যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা ঘটলে দ্রুত জড়িতদের চিহ্নিত করা যায়। সরকারি নির্দেশনা মেনে কমিটি গঠনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উৎসব উদযাপনে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
পূজার আনুষ্ঠানিক নির্ঘণ্ট অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর শুভ মহালয়ার মাধ্যমে দেবীর আবাহন শুরু হয়েছে। আগামী ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে মূল পূজা শুরু হবে এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটবে। শাস্ত্রমতে, এ বছর দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ঘটবে ঘোড়ায় চড়ে এবং প্রস্থান হবে নৌকায়।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন