মো: ফরহাদ হোসেন
নভেম্বর ২৭, ২০২৫, ০৫:০৭ পিএম
ছবি-দিনাজপুর টিভি
শীতের সকাল। ভোরের আলো তখনো ভালো করে ফোটেনি। ঘন কুয়াশায় ঢাকা গ্রামীণ জনপদের সেই কুয়াশাভেজা সরু মেঠো পথ ধরে এক হাতে একটি জরাজীর্ণ ব্যাগ আর অন্য হাতে লাঠিতে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে চলেছেন এক বৃদ্ধা। গন্তব্য ফসলের মাঠ। নাম তাঁর সুফিয়া বেগম (৮০)।
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর আর ভাঙা পা নিয়ে ধানের জমিতে পরিত্যক্ত শীষ কুড়িয়েই তিনি বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনছেন। দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার সুজালপুর ইউনিয়নের কোমরপুর গ্রামে এই বৃদ্ধার বসবাস।
জীবনের কঠিন বাস্তবতা—ফসলের মাঠে ধান কাটা শেষ হওয়ার পর জমিতে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত ধানের শীষ সংগ্রহ করাই সুফিয়া বেগমের নিত্যদিনের কাজ।
ভাঙা পা আর ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তি নিয়ে জমির এক কোণে মাথা নিচু করে যখন তিনি ধান কুড়ান, তখন তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপেই ফুটে ওঠে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার এক করুণ চিত্র।নিজের কষ্টের কথা জানাতে গিয়ে সুফিয়া বেগম বলেন, "এক পা ভাঙা, চোখেও ভালো করে দেখি না। কিন্তু পেট তো খায়, তাই ধানের শীষ কুড়াতে বেরিয়েছি। দৈনিক ৫ থেকে ৬ কেজি ধান যেটুকু পাই, তাতেই আল্লাহর রহমতে দিন চলে যাবে। এক মুঠো ধানও আমার কাছে বড় দয়া।
স্বামী আব্দুল কাদের মারা গেছেন বহু বছর আগে। একসময় ভরা সংসার থাকলেও এখন তিনি বড় একা। বড় ছেলে ঢাকায় পোশাক কারখানায় কাজ করেন, সেখানেই পরিবার নিয়ে থাকেন। ছোট ছেলে রিকশা চালান, কখনো আবার রাত জেগে নৈশপ্রহরীর কাজ করেন। ছেলেদের নিজেদের সংসারই চলে অভাব-অনটনে।বয়স্ক ভাতা হিসেবে যা পান, তা দিয়ে পুরো মাসের ওষুধ আর খাবারের খরচ মেটানো অসম্ভব। তাই পেটের দায়ে প্রতিদিন লাঠিতে ভর দিয়ে তাঁকে বের হতে হয়। কখনো ৫-৬ কেজি ধান কুড়িয়ে, আবার কখনো মানুষের দয়ায় পাওয়া খাবারেই দিন কাটে তাঁর।
প্রতিবেশী জরিনা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, "তাঁকে খুব কষ্টে থাকতে দেখি। সন্তানেরা গরিব। এই বয়সে ভাঙা পা নিয়ে পেটের দায়ে যখন তাঁকে শীষ কুড়াতে দেখি, তখন মনটা কেমন হয়ে যায়।"পাশের জমির কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, "এই বয়সে শীষ কুড়ানো সত্যিই অমানবিক কষ্টের। নিয়মিত সরকারি বা বিত্তবানদের সহায়তা পেলে তাঁকে এতটা কষ্ট করতে হতো না।"এ ব্যাপারে সুজালপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মো. সেলিম রেজা জানান, "সরকারি কোনো বরাদ্দ এলেই তাঁকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।"