আগস্ট ২১, ২০২৬, ১১:০১ পিএম
মানুষের জীবনের আসল অর্থ কী, আমরা কেন অবিরাম ছুটে চলেছি—এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর নিজের মতো করে খোঁজেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর জুয়েল রানা। সম্প্রতি `জংশন` নামের একটি পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে উপস্থাপক ফারাবি হাফিজের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় তিনি তুলে ধরেছেন জীবনের নিগূঢ় সব সত্য। করপোরেট জীবনের চাকচিক্য ছেড়ে কেন তিনি গ্রামে ফিরে গেছেন, আড্ডায় উঠে এসেছে সেই গল্পও। জীবনের পাওয়া-না পাওয়া, সম্পর্ক এবং মৃত্যু নিয়ে তার নিজস্ব দর্শন সাধারণ মানুষের চিন্তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
জীবনের প্রকৃত মানে খুঁজতে গিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন এক অন্য রকম পথ।একসময় ব্যাংকের ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন জুয়েল রানা। হঠাৎ একদিন ছুটি পেয়ে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তার জীবনের মোড় পুরোপুরি ঘুরে যায়। মাঝরাতে বাড়ির পুরোনো উঠানে দাঁড়িয়ে তার মনে হয়, উঠানটা যেন আগের চেয়ে ছোট হয়ে গেছে। সকালে ঘুম ভেঙে দেখেন, মায়ের রান্নাবান্না শেষ হতে অনেক দেরি হচ্ছে, অথচ ছোটবেলায় তিনি ঘুম থেকে ওঠার আগেই মায়ের সব কাজ শেষ হয়ে যেত। এই দৃশ্য দেখে তিনি বুঝতে পারেন, বাড়ির উঠান ছোট হয়নি, বরং মায়ের বয়স বাড়ছে এবং কাজের গতি কমে যাচ্ছে।
মায়ের বয়স বাড়ার এই নির্মম বাস্তবতা তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। সব ছেড়ে দিয়ে তিনি গ্রামে নিজের মতো করে বাঁচার সিদ্ধান্ত নেন। শহরের ইট-পাথরের জীবন আর যান্ত্রিকতার প্রতি তার কোনো মোহ নেই। তার মতে, গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় বিলাসবহুল ভবনের অসংখ্য ঘর ফাঁকা পড়ে থাকে, অথচ বাইরের ফুটপাতে মানুষ আশ্রয়হীন রাত কাটায়। এই সভ্যতার আয়োজন মানুষের কল্যাণের চেয়ে বাণিজ্যের জন্যই বেশি তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তার চোখে, মানুষ কেবলই হাঁপায় আর ছোটে, কিন্তু দিন শেষে তাদের যাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট জায়গা থাকে না। জীবনের প্রতি লোভ ও জাগতিক লালসা কমানোর জন্য তিনি প্রতিদিন সন্ধ্যায় আধা ঘণ্টার জন্য জেলা সদর হাসপাতালে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি মানুষের চরম অসহায়ত্ব আর কষ্ট নিজ চোখে দেখেন। কেউ দুর্ঘটনায় পা কেটে এসেছে, কেউ বা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে—এই দৃশ্যগুলো তাকে মনে করিয়ে দেয় যে তিনি নিজে কতটা ভালো আছেন। অন্যদের কষ্ট দেখে তিনি নিজের জীবনের প্রতি একধরনের প্রশান্তি খুঁজে পান।
হাসপাতালের এই পরিবেশ তাকে প্রতিদিন নতুন করে বাঁচার প্রেরণা দেয়। একদিন হাসপাতালে তিনি দেখেন, এক ব্যক্তি সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়েছেন। পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধার পরপরই ওই ব্যক্তি স্ত্রীকে ফোন করে বলেন যে তিনি একটু পরেই বাসায় ফিরছেন। কতটা রক্তপাত হয়েছে বা কতটা বড় বিপদ থেকে তিনি বেঁচে ফিরেছেন, তার বিন্দুমাত্র ধারণাও তিনি স্ত্রীকে দেননি। পুরুষদের এই নিঃশব্দ আত্মত্যাগ আর দায়িত্ববোধ তাকে প্রবলভাবে মুগ্ধ করে। পরিবারের হাসিমুখ দেখার জন্য একজন পুরুষ কত কষ্ট নীরবে সহ্য করে যান, এটি তার এক বড় প্রমাণ।
বাইরের পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা একা সামলে পুরুষরা প্রতিনিয়ত সংসারের দায়িত্ব পালন করে চলেন। সুখ বলতে আসলে কী বোঝায়, এ নিয়েও আড্ডায় আলোচনা হয়। জুয়েল রানার মতে, সুখের সমার্থক শব্দ হলো `অভাব`। মানুষ যখন কোনো কিছুর অভাবে থাকে এবং সেটি পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়, তখনই তার মধ্যে সত্যিকারের আনন্দ বেঁচে থাকে। ছোটবেলায় একটি লাল সাইকেল বা একটি লাটিম কেনার জন্য মানুষের যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকে, বড় হয়ে দামি গাড়ি কিনলেও সেই একই আনন্দ আর পাওয়া যায় না। সবকিছু হাতের নাগালে পেয়ে গেলে মানুষের জীবন থেকে আবিষ্কারের নেশা আর প্রাপ্তির আনন্দ হারিয়ে যায়।
পেয়ে যাওয়ার পর মানুষের কাছে প্রতিটি জিনিসেরই গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমে আসে। মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝাতে গিয়ে তিনি সুলতান সুলেমানের একটি উদাহরণ টানেন। মারাত্মক অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ঠিক আগেও সুলতান তার সৈন্যদের সামনে লাঠিতে ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। মনের জোরে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে শারীরিক শক্তির চেয়ে মানসিক দৃঢ়তাই সবচেয়ে বড় শক্তি। মানুষের জীবনে প্রিয়জনের একটুখানি ভরসা থাকলে যেকোনো বড় দুঃখও অনায়াসে জয় করা সম্ভব।
কিন্তু বাস্তব জীবনে প্রিয় মানুষদের কাছ থেকেই মানুষ সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার হয়। পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের কুবের আর কপিলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রেমের মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন। কাছে পাওয়ার আগে কপিলার যে ব্যাকুলতা ছিল, কুবেরকে পুরোপুরি পেয়ে যাওয়ার সুযোগ আসার পর তা আর থাকেনি। মানুষ দূর থেকে যেকোনো জিনিসকে বেশি সুন্দর মনে করে। ভুল মানুষের প্রেমে পড়ে তার পেছনে সারাজীবন ছুটে বেড়ানোতেই যেন এক অদ্ভুত আনন্দ লুকিয়ে থাকে। হাতের মুঠোয় সবকিছু পেয়ে গেলে ভালোবাসার সেই তীব্র আবেগ আর আগের মতো জীবন্ত থাকে না।
দূরত্ব আর না-পাওয়ার বেদনাতেই মূলত ভালোবাসার প্রকৃত সৌন্দর্য বেঁচে থাকে। মৃত্যু নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা নির্মম হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি খোলামেলা কথা বলেন। বৃষ্টির দিনে কবরস্থানে কাদাপানির মধ্যে কলাগাছের ভেলা ভাসিয়ে প্রিয়জনের লাশ নামানোর দৃশ্য তাকে ভীষণ নাড়া দেয়। মানুষ মারা গেলে তার আপনজনেরাই সবচেয়ে বেশি তাড়াহুড়া করে মৃতদেহটিকে মাটির নিচে রেখে আসার জন্য। ২৫ বছর ধরে এক বিছানায় থাকা স্বামী মারা যাওয়ার পর স্ত্রীও সেই লাশের পাশে একা থাকতে ভয় পান।
পৃথিবী কাউকে মনে রাখে না, মানুষের শূন্যস্থান খুব দ্রুতই নতুন কেউ দখল করে নেয়। আলাপচারিতার একপর্যায়ে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সাক্ষাতের গল্প শোনান। একবার ডাক পেয়ে খুব সাধারণ পোশাকেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে হাজির হয়েছিলেন। বরাদ্দকৃত মাত্র ২০ মিনিটের আড্ডা গড়িয়েছিল ১ ঘণ্টা ৪২ মিনিটে, যেখানে উঠে এসেছিল সাহিত্য আর জীবনের নানা গল্প। প্রধানমন্ত্রী তার এই সাধারণ জীবনযাপন ও চিন্তাধারার দারুণ প্রশংসা করেছিলেন এবং তাকে কখনোই না বদলানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থেকেও প্রধানমন্ত্রীর জীবনযাপন তাকে মুগ্ধ করেছিল।
সেদিন সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ১৪৯ টাকার একটি প্যাকেজের সাধারণ খাবার খেয়েছিলেন। ভাত, ডাল আর করোলা ভাজির মতো সাধারণ খাবার খেয়েই তিনি দিন পার করেন। জুয়েল রানার মতে, মানুষের জীবন মূলত খুব সামান্য কিছুতেই সুন্দরভাবে কাটানো সম্ভব। অতিরিক্ত চাওয়া-পাওয়া আর ছুটতে থাকার প্রতিযোগিতাই মানুষের জীবনের সব শান্তি কেড়ে নেয়। তিনি তার বাকি জীবন প্রকৃতির কাছাকাছি থেকেই সাধারণ মানুষের মতো পার করে দিতে চান।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন