অক্টোবর ৭, ২০২৬, ১২:৩২ পিএম
ক্ষেতে ফলন হচ্ছে, সেই সবজি বাজারে উঠছে এবং প্রতিদিনের খাবারের থালায় পৌঁছে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের। কিন্তু ক্ষেতের উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার খাবার টেবিল পর্যন্ত এই দীর্ঘ পথচলায় খাদ্য নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় কাঁচা সবজিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ এবং মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উদ্বেগজনক উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে দেখা যায়, গরম কিংবা অফসিজনে রোগবালাই ও পোকার আক্রমণের মুখে কৃষকেরা মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক স্প্রে করতে বাধ্য হচ্ছেন। তৃণমূল পর্যায়ে সরকারি কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত দিকনির্দেশনা ও সরাসরি তদারকি না থাকায় কৃষকদের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠছে স্থানীয় কীটনাশকের দোকানগুলো। কীটনাশক বিক্রেতারা বিভিন্ন বাণিজ্যিক কোম্পানির তথ্যের ওপর নির্ভর করে কৃষকদের বালাইনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। অনেক বিক্রেতা চার দশক ধরে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই ওষুধ বিক্রি করছেন বলে দাবি করলেও রাসায়নিকের ক্ষতিকর দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি সম্পর্কে কৃষকদের কোনো সুস্পষ্ট ধারণা দিতে পারছেন না।
কৃষিবিজ্ঞানীদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে ফসলে বালাইনাশক ছিটানোর পর অন্তত এক সপ্তাহ বা সাত দিন পর্যন্ত তা তোলা কিংবা কাটা যাবে না। কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় এই নির্দেশনার তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। অনেক কৃষক ওষুধ ছিটানোর মাত্র দুই-তিন দিনের মাথায় ফসল তুলে বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন। এর ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিকের বড় একটি অবশিষ্টাংশ সবজির ভেতরেই থেকে যায়।
সবচেয়ে ভীতিকর বিষয় হলো, মাঠের সবজিতে যে সমস্ত বালাইনাশক অবাধে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ম্যানকোজেব এবং কারটাপ গ্রুপের মতো মারাত্মক বিষাক্ত রাসায়নিক। চরম বিষাক্ততার কারণে এই ধরনের উপাদানগুলোর ব্যবহার ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের বহু দেশে ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ক্ষেত থেকে তোলার পর কৃষকের বাড়ি হয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে এসব সবজি রাজধানী ঢাকার পাইকারি ও খুচরা বাজারে পৌঁছায়।
তবে বিপত্তি শুধু ক্ষেতের রাসায়নিকেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর খিলক্ষেত কাঁচাবাজারে প্রবেশের মুখে দেখা যায় ডোবার চরম নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে সকালজুড়ে ধোয়া হচ্ছে শাকসবজি। যে পানি খালি চোখে দেখলে গা গুলিয়ে ওঠে, সেই পানি দিয়ে পরিষ্কার করা শাকসবজি সরাসরি চলে যাচ্ছে গৃহস্থালির রান্নাঘরে। খুচরা বিক্রেতারা একে সাধারণ অভ্যাস দাবি করে জানান, তারা বহু বছর ধরে এভাবেই শাকসবজি ধুয়ে বিক্রি করে আসছেন।
বাজারে গিয়ে সাধারণ ক্রেতারা কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য বা পোকার আক্রমণ দেখে সবজি বাছাই করেন। অথচ সাধারণ চোখে সবজির অভ্যন্তরে জমে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিক কিংবা ভারী ধাতু বোঝার কোনো উপায় নেই। অনেকে ধারণা করেন বাসায় এনে ভালো করে ধুলে বা সাধারণ পানিতে ভিজিয়ে রাখলে সবজির বিষাক্ততা দূর হয়ে যায়। কিন্তু গবেষকেরা বলছেন, এতে ক্ষতিকর উপাদান পুরোপুরি দূর হয় না। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসুরক্ষায় বাজার থেকে আনা সবজি পর্যায়ক্রমে ভিনেগার মিশ্রিত পানি এবং এরপর লবণ পানিতে ধোয়ার পরামর্শ দেন সচেতন নাগরিকেরা।
সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় বাজারে বিক্রি হওয়া সবজিতে ভারী ধাতু ও বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশের গড় মাত্রা অনুমোদিত আন্তর্জাতিক সীমার চেয়ে অনেক বেশি। ক্ষতিকর উপাদানের এই তালিকায় বেগুন, শসা এবং টমেটো সবচেয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে।
গবেষকদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নিয়ম না মেনে সময়সীমা পার হওয়ার আগেই সবজি তুলে বাজারে আনলে খাদ্যের মাধ্যমে রাসায়নিক সরাসরি মানুষের পেটে চলে যায়। এর ফলে মানবদেহে অন্তত ৩৮ ধরনের ক্যানসার বা দূরারোগ্য ব্যাধি সৃষ্টির বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন যে কীটনাশক প্রয়োগ করলেই সবজি বিষাক্ত হয়ে যায় না। মূল বিপদ তৈরি হয় অতিরিক্ত মাত্রা ব্যবহার, নির্ধারিত নিয়ম না মানা এবং ফসল তোলার আগে প্রয়োজনীয় সময় অপেক্ষা না করার কারণে। ভারী ধাতু একবার মানবদেহের রক্ত ও কোষে প্রবেশ করলে তা বন্দুকের গুলির মতো স্থায়ী ক্ষতি করে। বিষমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে মাঠের কৃষক থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে কঠোর ও সার্বক্ষণিক প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন