বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬,

ইরানকে সমর্থনের চেয়ে জ্বালানি ও কূটনীতিকে প্রাধান্য দিচ্ছে চীন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মার্চ ৫, ২০২৬, ১১:৪৩ এএম

ইরানকে সমর্থনের চেয়ে জ্বালানি ও কূটনীতিকে প্রাধান্য দিচ্ছে চীন

চীন ও জ্বালানি রাজনীতি

ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় বেইজিং তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত তারা নিজেদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের মিত্র ইরানকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি চীন নেবে না। 

বিশেষ করে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে বেইজিং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলছে। চীন তার প্রয়োজনীয় তেলের একটি বিশাল অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে, যার বড় একটি ভাগ আসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। বর্তমানে এই জলপথ ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকায় বেইজিংয়ের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী চীন তার অভ্যন্তরীণ তেলের চাহিদার মাত্র ৩০ শতাংশ নিজস্ব উৎস থেকে মেটাতে পারে। বাকি ৭০ শতাংশের জন্য দেশটিকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। 

২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী চীনের সমুদ্রপথে আমদানি করা তেলের প্রায় ৫৭ শতাংশই এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এর মধ্যে ইরান থেকে আসে দৈনিক প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল তেল। তবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হলেও বেইজিং আগে থেকেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার জানিয়েছে যে চীনের কাছে বর্তমানে প্রায় ১২০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে যা দিয়ে তারা পরবর্তী ১১৫ দিনের আমদানি ঘাটতি অনায়েসেই সামাল দিতে পারবে। 

এই বিশাল মজুত থাকায় চীন এখন সামরিক উত্তেজনার পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানের দিকেই বেশি মনোনিবেশ করতে পারছে।কূটনৈতিক এই কৌশলের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে আগামী ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনকে। হোয়াইট হাউসের সূত্রমতে এই বৈঠক বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্ক নির্ধারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হবে। বিশ্লেষকদের মতে যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনকে তেল আমদানিতে সরাসরি বাধা না দেয়, তবে ইরান সংকটের কারণে শি-ট্রাম্প সম্মেলন ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। 

বেইজিং ইরানকে একটি শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদার হিসেবে মনে করলেও তাদের সরাসরি সামরিক মিত্র হিসেবে বিবেচনা করে না। এছাড়া সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের সঙ্গে চীনের গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকায় তারা কেবল ইরানের পক্ষে গিয়ে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াতে চাইছে না।চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এই সংঘাতের কড়া নিন্দা জানিয়েছে এবং তেহরানে একজন চীনা নাগরিকের নিহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছে। 

মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং জানিয়েছেন যে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কাজ হলো অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করা। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন যে চীন কেবল শক্ত কথার মধ্যেই তার প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ রাখবে। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় চীন যেভাবে রাশিয়াকে সমর্থন দিয়েছিল, ইরানের ক্ষেত্রে তেমনটি হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে চীন বিকল্প হিসেবে রুশ তেলের দিকে আরও বেশি ঝুঁকতে পারে। শেষ পর্যন্ত নিজের বিশাল অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন চীনের প্রধান লক্ষ্য।