এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের নিয়মিত নৌবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে তেহরান এখনো শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। বিশেষ করে ছোট ও অত্যন্ত দ্রুতগামী নৌযানের বহর ব্যবহার করে মার্কিন বাহিনীকে ক্রমাগত চাপের মুখে রাখছে দেশটি। এই বিশেষ নৌবাহিনী প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের কাছে ‘মশা নৌবহর’ নামে পরিচিত।
মূলত আড়ালে লুকিয়ে থেকে অতর্কিত হামলা চালানোর অসাধারণ সক্ষমতা এই বহরটিকে সমুদ্রে অপরাজেয় করে তুলেছে।মশা নৌবহর মূলত ছোট ও ক্ষিপ্রগতির একগুচ্ছ নৌকার সমন্বয়ে গঠিত, যা মূলত পণ্যবাহী বা যুদ্ধজাহাজের চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর বা আইআরজিসি এই বহরটি পরিচালনা করে, যা দেশটির নিয়মিত নৌবাহিনী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি কমান্ড হিসেবে কাজ করে। উপকূলের অত্যন্ত গোপন আস্তানা থেকে এই ছোট নৌকাগুলো পরিচালনা করা হয় এবং এগুলো থেকে ড্রোন বা স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা যায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে এটিই এখন প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।দীর্ঘদিন ধরে লোহিত সাগরে যুদ্ধবিরতি না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার হুমকি দিলেও গত শুক্রবার ইরান এটি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্টের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। তেহরানের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত না হচ্ছে, ততক্ষণ ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ বহাল থাকবে।
ইরানি সামরিক বাহিনীর রণকৌশল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সাঈদ গোলকার বলেন, আইআরজিসি নৌবাহিনী মূলত সমুদ্রে একটি গেরিলা বাহিনীর মতো আচরণ করে। তার মতে, তারা প্রথাগত বড় যুদ্ধজাহাজ ব্যবহারের পরিবর্তে অতর্কিত হামলা চালিয়ে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে যাওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে। এই ধরনের যুদ্ধরীতি মার্কিন নৌবাহিনীর মতো বিশাল শক্তির জন্য মোকাবিলা করা বেশ কঠিন।
এদিকে জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম এজেন্সি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় এই অঞ্চলে অন্তত ২০টি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। আইআরজিসি এসব হামলার দায় সরাসরি স্বীকার না করলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এগুলো মূলত উপকূলে অবস্থিত ভ্রাম্যমাণ লঞ্চার থেকে ছোড়া ড্রোনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। ৮ এপ্রিল ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এক বিবৃতিতে জানান যে, যুদ্ধের শুরু থেকে ইরানের নিয়মিত নৌবাহিনীর প্রায় ৯০ শতাংশ জাহাজ ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, মশা নৌবহরের মাত্র অর্ধেক বোট ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে, বাকিগুলো এখনো সক্রিয়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বোটগুলো আকারে এতটাই ছোট যে কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে এগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। ইরান এগুলোকে উপকূলীয় পাহাড়ের ভেতর খনন করা গভীর গুহায় লুকিয়ে রাখে। সেখান থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে এগুলোকে মোতায়েন করা সম্ভব। মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল গ্যারি রাফহেড এই শক্তিকে একটি স্থায়ী বাধা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি মনে করেন, এই ক্ষুদ্র নৌবহরের উদ্দেশ্য বা পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সব সময়ই অনিশ্চিত।
ঐতিহাসিকভাবে ১৯৮৬ সালের দিকে আইআরজিসি এই নৌবহরটি গড়ে তোলে। বিশেষ করে ইরান-ইরাক যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে তারা বুঝতে পারে যে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো মহাশক্তির সাথে সরাসরি লড়াইতে জেতা সম্ভব নয়। সেই উপলব্ধ থেকেই তারা এই ‘স্টিলথ’ বা গোপন নৌবাহিনী গঠনের দিকে মনোযোগ দেয়। বর্তমানে এই বাহিনীতে প্রায় ৫০ হাজার সদস্য রয়েছে যারা পাঁচটি ভিন্ন সেক্টরে বিভক্ত হয়ে কাজ করে। তাদের প্রশিক্ষিত বিশেষ কমান্ডো বাহিনী এবং উচ্চগতির সামুদ্রিক ড্রোনগুলো যেকোনো আধুনিক নৌবাহিনীর জন্য মাথা ব্যথার কারণ।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণী সংস্থা জেনেস-এর বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স পেপ জানিয়েছেন, ইরান অতি সম্প্রতি তাদের নৌবহরে আরও শক্তিশালী নৌযান যুক্ত করার চেষ্টা করেছিল, যার অনেকগুলোই মার্কিন হামলায় ধ্বংস হয়েছে। তবে সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো রক্ষা করা এখনো একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আরোপিত নৌ-অবরোধ কার্যকর করতে মার্কিন জাহাজগুলো এখন প্রণালির ভেতরে না ঢুকে কিছুটা দূরে ওমান উপসাগর বা আরব সাগরে অবস্থান করছে।
কারণ প্রণালির ভেতর মশা নৌবহরের ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় না। মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে মশা নৌবহর ইরানের জন্য যেমন একটি বড় প্রতিরক্ষা দেয়াল, তেমনি বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার জন্য একটি ধ্রুবক আশঙ্কা।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন