মে ৩১, ২০২৬, ১১:১৩ এএম
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরানের চলমান যুদ্ধ থেকে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান বা আসল বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে তুরস্ক। এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে কোনো বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া ছাড়াই দেশের অভ্যন্তরে তাঁর স্বৈরতান্ত্রিক ও শাসনতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণকে ত্বরান্বিত করার বড় সুযোগ করে দিয়েছে।
বিশ্বের নজর যখন সম্পূর্ণ অন্য দিকে নিবদ্ধ রয়েছে, সেই সুনির্দিষ্ট মুহূর্তটিকে নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়ে তিনি দেশের ভেতরে বিরোধীদের ওপর দমনপীড়ন তীব্র করছেন। একই সঙ্গে বিশ্বমঞ্চে তুরস্কের কূটনৈতিক অবস্থানকেও তিনি আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ও শক্তিশালী করে তুলেছেন।
আন্তর্জাতিক এই সংকটের আড়ালে দেশটির প্রধান বিরোধী দলের ওপর রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন এখন চরম আকার ধারণ করেছে।সম্প্রতি তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টির সদর দপ্তরে দেশটির দাঙ্গা পুলিশ জোরপূর্বক প্রবেশ করে অভিযান চালিয়েছে।
এর ঠিক তিন দিন আগে একটি তুর্কি আদালতের বিতর্কিত আদেশের মাধ্যমে দলটির প্রধান নেতা ওজগুর ওজেলকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। আদালতের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কার্যালয়ের ভেতরে অবস্থান নেওয়া সাধারণ সমর্থকদের সরাতে পুলিশ নির্বিচারে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করেছে। বিশ্লেষকদের অনেকেই এই ঘটনাকে দেশটির অবশিষ্ট নাগরিক ও স্বাধীনতার শেষ চিহ্নটুকু সম্পূর্ণ মুছে ফেলার একটি সুদূরপ্রসারী প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।এরদোয়ানের এই অভ্যন্তরীণ একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার পেছনে কাজ করছে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য বদলের রাজনৈতিক সমীকরণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কাগুলো এরদোয়ানকে দেশের অভ্যন্তরে অবশিষ্ট গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে যা খুশি তা-ই করতে এক প্রকার উৎসাহিত করছে। তিনি মূলত ২০২২ সাল থেকে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বৈশ্বিক আস্থা কমে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শূন্যতাকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছেন। এই বিশেষ পরিস্থিতির কারণে ইউরোপীয় দেশ, ন্যাটো মিত্র এবং প্রতিবেশীরা বর্তমানে এরদোয়ানের সঙ্গে নানা বিষয়ে কাজ করতে এক প্রকার বাধ্য হচ্ছে। ফলে তুরস্কের অভ্যন্তরীণ স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে এখন আর কোনো বড় ধরনের সমালোচনা বা প্রতিক্রিয়া আসছে না।
এর আগে এরদোয়ানের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও ইস্তাম্বুলের জনপ্রিয় মেয়র একরেম ইমামোগ্লুকে গ্রেপ্তারের পর ২০২৫ সালের মার্চ মাসে তুরস্কে বড় ধরনের গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক নয় দিন পর ইমামোগ্লুর বিরুদ্ধে একটি সাজানো বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন অপরাধমূলক সংগঠন পরিচালনার গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে, যার ফলে সম্মিলিতভাবে দুই হাজার বছরেরও বেশি কারাদণ্ড হতে পারে। মূলত ২০২৩ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অল্প ব্যবধানে জয়ী হওয়ার পর থেকে তুরস্কে মূল্যস্ফীতি গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই অর্থনৈতিক সংকট এরদোয়ানের জনপ্রিয়তায় কিছুটা প্রভাব ফেলায় তিনি ২০বছরের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আগেই বিরোধীদের সম্পূর্ণ কোণঠাসা করার চেষ্টা করছেন।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় সুযোগও পুরোপুরি নিচ্ছেন এরদোয়ান। এই অঞ্চলের অনেক দেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ সুরক্ষার ওপর আস্থা হারিয়ে সামরিক সহায়তার জন্য সরাসরি তুরস্কের দিকে ঝুঁকছে। চলতি মে মাসে ইরাক ২০টি তুর্কি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার জন্য একটি বড় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া এই মাসে তুরস্ক থেকে ৬০টি পর্যন্ত চালকবিহীন আধুনিক যুদ্ধবিমান বায়রাক্তার কিজিললেমা কেনার চুক্তি চূড়ান্ত করেছে, যার সরবরাহ ২০ can বছর বা ২০২৮ সাল থেকে শুরু হবে। পাশাপাশি পর্তুগালকে দুটি সামরিক সহায়তা জাহাজ সরবরাহের জন্য একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তিও বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে। এরদোয়ানের অধীনে তুরস্ক এখন বিশ্বের ১১তম বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে এবং তাদের উৎপাদিত ড্রোন ইউক্রেন থেকে লিবিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে সফলভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা খাতের এই বিপুল অগ্রগতি এরদোয়ানের অভ্যন্তরীণ অবস্থানকে আরও বেশি চাঙ্গা করছে। বর্তমানে তিনি তুরস্ককে একটি প্রধান আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উত্তোলন, নতুন পাইপলাইন স্থাপন এবং সমুদ্র বন্দরগুলোকে সংযুক্ত করার কাজ করছেন। এছাড়া আঙ্কারা পারস্য উপসাগর থেকে নিজেদের ব্যবসা ও সম্পদ স্থানান্তরিত করতে চাওয়া বিদেশিদের জন্য তুরস্কে আসার ক্ষেত্রে ২০ বছরের কর ছুটির বিশেষ প্রস্তাব দিচ্ছে। আগামী জুলাইয়ের শুরুতে যখন এরদোয়ান ন্যাটো জোটের একটি বড় শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করবেন, তখন তিনি ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থান ও ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে বিশ্বনেতাদের সাথে কথা বলবেন।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা

-20260531034251.jpg)
-20260530135340.jpg)
দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন