এপ্রিল ২০, ২০২৬, ১০:২২ এএম
জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজার যখন টালমাটাল, তখনই সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে চাপের খবর আসছে। দেশের বাজারে জ্বালানি পণ্যের রেকর্ড দাম বৃদ্ধির রেশ কাটতে না কাটতেই এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত দাম বৃদ্ধির একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।
এই প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভার সবুজ সংকেত পেলেই পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) পাঠানো হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে বর্তমানে ইতিহাসের সর্বোচ্চ দামে ডিজেল ও পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে মাত্র ১৮ দিনের ব্যবধানে দুই দফায় বেড়েছে এলপি গ্যাসের দাম।
নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির এই কঠিন সময়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এমন উদ্যোগ সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো মনে করছে, জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বাড়ছে, তাদের আয় সেভাবে বাড়ছে না। সাধারণ মানুষের অনেকেরই আশঙ্কা, বিদ্যুৎ বিল বাড়লে বাড়িভাড়া থেকে শুরু করে সব ধরনের পরিষেবার খরচ বেড়ে যাবে, যা মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়াবে।বিদ্যুৎ বিভাগের তৈরি করা সারসংক্ষেপে এই খাতে বড় ধরনের আর্থিক ঘাটতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। নথিপত্র অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ঘাটতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৫৬ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে।
এই বিশাল লোকসান বা ঘাটতি কমিয়ে আনতে তিনটি ভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে পিডিবি। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে দাম সমন্বয় করে সরকারি ভর্তুকি ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এই প্রস্তাবনার একটি অংশে লাইফলাইন গ্রাহক বা অতি অল্প বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের বাইরে রেখে অন্যান্য সব আবাসিক গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের হার বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানিয়েছেন যে, দাম বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে ঠিকই, তবে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।
এটি একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দাম বাড়িয়ে ঘাটতি মেটানোর চেয়ে ব্যয় কমানোর দিকে নজর দেওয়া বেশি জরুরি। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম মনে করেন, বিদ্যুৎ খাতে অপচয় এবং অযৌক্তিক খরচ বন্ধ করতে পারলে এই সংকট অনেকখানি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তাঁর মতে, মুনাফার হিসাব বাদ দিয়ে বিদ্যুতের প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, আমদানিনির্ভর ফার্নেস অয়েলের বদলে দেশীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে। এতে ভারতের আদানি পাওয়ার বা বেসরকারি কেন্দ্রগুলো থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে। সঠিকভাবে কয়লার সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব বলেও মনে করেন তারা।
এদিকে বিদ্যুতের দাম ও জ্বালানি পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য অর্থমন্ত্রীকে প্রধান করে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারের নথিতে উল্লেখ আছে যে, আগামী দুই বছর দাম না বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সরকারকে বিকল্প এই পথে হাঁটতে হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হয়, তা জানতে বিইআরসির গণশুনানি ও মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকতে হবে দেশবাসীকে।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন