সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬,
জ্বালানি সাশ্রয় কৌশল

সৌরবিদ্যুতে ইউনিট প্রতি সাশ্রয় ৫-৬ টাকা কমবে বিপুল অঙ্কের বিদ্যুৎ বিল

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ১২, ২০২৬, ১১:২৪ এএম

সৌরবিদ্যুতে ইউনিট প্রতি সাশ্রয় ৫-৬ টাকা কমবে বিপুল অঙ্কের বিদ্যুৎ বিল

সৌরবিদ্যুতে ইউনিট প্রতি সাশ্রয় মিলছে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় টাকা, যা জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান খরচের মুখে গ্রাহকদের জন্য বড় স্বস্তি এনে দিচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে কাজ করছে সরকার। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) হালনাগাদ তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮৭১ দশমিক পাঁচ মেগাওয়াট। এর মধ্যে এককভাবে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা এক হাজার ৫৭৮ দশমিক ৪১৫ মেগাওয়াট। 

এই সক্ষমতার মধ্যে এক হাজার ২০০ দশমিক ৯৪ মেগাওয়াট সরাসরি জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত এবং বাকি ৩৭৭ দশমিক ৪৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডের বাইরে উৎপাদিত হচ্ছে। ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে সৌরবিদ্যুতের আর্থিক সুবিধা নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম।

তিনি জানান, চাহিদা অনুযায়ী ব্যক্তিগত পর্যায়ে সৌর প্যানেল স্থাপন করা গেলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ন্যূনতম পাঁচ থেকে ছয় টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। এতে যেমন সরকারের জাতীয় কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত ভর্তুকির চাপ কমবে, তেমনি যেসব আবাসিক পরিবারে বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি তারাও নিজেদের মাসিক বিল উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নামিয়ে আনতে সক্ষম হবে।

দিনের বেলায় গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য শিল্পকারখানাগুলোকে সাধারণত প্রতি ইউনিটে ১১ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে শুরু করে ১৬ টাকা ছয় পয়সা পর্যন্ত চড়া ট্যারিফ পরিশোধ করতে হয়। অন্যদিকে নিজস্ব কারখানার ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু রাখলে এই ব্যয় অনেক কমে আসে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্যকর খরচ হয় চার থেকে পাঁচ টাকা। আর ভূমিতে স্থাপিত বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে এই উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় প্রতি ইউনিটে আট থেকে নয় টাকা।

শফিকুল আলম আরও উল্লেখ করেন, সরকার যদি জমি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা দেয়, তবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় ব্যয় আনুমানিক ছয় টাকা ৫০ পয়সায় নামিয়ে আনা যায়। এসব রাষ্ট্রীয় সুবিধা না থাকলে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিট প্রতি ব্যয় দাঁড়ায় নয় টাকা।

বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল বসালে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি নিজ ভবনেই ব্যবহার করা সম্ভব হয়। ফলে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার নির্ভরতা হ্রাস পায়। অবকাঠামো স্থাপনের প্রাথমিক মূলধন, অর্থায়নের কৌশল, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ও প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরনের ওপর ভিত্তি করে সাধারণ গ্রাহকেরা দীর্ঘ মেয়াদে এই সাশ্রয় নিশ্চিত করতে পারেন।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) পরিসংখ্যান বলছে, প্রচলিত জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বর্তমানে সরকারি হিসাবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে খরচ হয় ১৩ টাকা ১৩ পয়সা। ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলোতে প্রতি ইউনিটের উৎপাদন ব্যয় গিয়ে ঠেকেছে ২৭ টাকা ৪০ পয়সায়। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে ব্যয় হয় আনুমানিক সাত টাকা নয় পয়সা।

মাঠপর্যায়ে সৌরশক্তির সফল ব্যবহারের বাস্তব দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে শেরপুর জেলার নকলা উপজেলার হুজুরীকান্দা গ্রামে অবস্থিত মতি অ্যাগ্রিভোলটাইক প্রকল্প।

প্রকল্পটির পরিচালক শহিদুল ইসলাম জানান, নিরাপদ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, সেচ কার্যক্রম ও প্রশাসনিক কার্যালয় পরিচালনায় সহায়তার অংশ হিসেবে সেখানে ৩৫ দশমিক তিন কিলোওয়াট ক্ষমতার দুটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

তিনি জানান, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ অংশের জন্য ২৬ দশমিক পাঁচ কিলোওয়াট এবং সেচপাম্প ও কার্যালয়ের চাহিদা মেটাতে আট দশমিক আট কিলোওয়াট ক্ষমতার ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। কেন্দ্রটিতে প্রতিদিন গড়ে মোট উৎপাদনক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, যার কারণে সেখানে কোনো ধরনের লোডশেডিংয়ের মুখে পড়তে হয় না।

এই কৃষিভিত্তিক সৌর প্রকল্প তৈরিতে মোট ব্যয় হয়েছে ৩০ লাখ টাকা, যার আনুমানিক কার্যকাল ধরা হয়েছে ২৫ বছর। শহিদুল ইসলাম বলেন, সাধারণ রক্ষণাবেক্ষণ ও খুচরা যন্ত্রাংশের খরচ বাদ দিলে তাদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিট খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন টাকা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও পাকিস্তানে এই উৎপাদন খরচ প্রতি ইউনিটে সাড়ে তিন থেকে চার টাকার মধ্যে ওঠানামা করে।

আবাসিক পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বড় সুফলের প্রমাণ মিলেছে এক স্বাধীন সমীক্ষায়। কোনো বাড়ির ছাদে যদি এমন ব্যাটারিযুক্ত সৌর ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় যা টানা নয় ঘণ্টার বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পারে, তবে সেই উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহারে ২০ বছরের হিসাবে প্রতি ইউনিটের গড় ব্যয় নেমে আসে সাত টাকা ৪৩ পয়সায়।

সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রাথমিক খরচ কমাতে এবং এর দ্রুত সম্প্রসারণ নিশ্চিতে সরকার সম্প্রতি নির্দিষ্ট কিছু আধুনিক সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে এক শতাংশ নির্ধারণ করেছে, যা পরবর্তী ১৮০ দিনের জন্য কার্যকর থাকবে।

এ ছাড়া ভবনের ছাদে ব্যাটারিসহ সৌর প্যানেল বসাতে উৎসাহিত করতে সরকারি প্রণোদনা চালু করা হয়েছে। এই সুবিধার আওতায় উৎপাদিত বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রাহকেরা সরাসরি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বা নেট মিটারিং করতে পারবেন, যার বিনিময়ে প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা করে পরিশোধ করা হবে। এটি ব্যক্তিগত ব্যয় কমানোর পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে ভূমিকা রাখবে।

কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ হাসান মেহেদী জানান, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলো দেশের জ্বালানি আমদানির তীব্র পরনির্ভরশীলতা অনেকখানি কমিয়ে দিতে পারে।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোলিয়াম সরবরাহ মারাত্মক বাধার মুখে পড়ছে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তা টিকিয়ে রাখতে সৌরবিদ্যুৎ একটি কৌশলগত বিকল্প। ফলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বিস্তার ঘটাতে সরকারের পক্ষ থেকে আরও জোরালো নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। ২০২৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদি জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে শুধু ভূমিতে স্থাপিত সৌর প্রকল্প থেকেই পাঁচ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২০২৮ সালের মধ্যে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় নয় টাকা ১২ পয়সা দরে মোট ৯১৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কিনতে ১২টি স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের (আইপিপি) সঙ্গে ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, নিজস্ব অর্থায়নে গ্রিড-সংযুক্ত ৬৮৯ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পও হাতে নিয়েছে বোর্ড, যা ২০৩০ সালের মধ্যেই পুরোদমে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যের তীব্র ওঠানামার ঝুঁকি কমাতে এই রূপান্তর কাজ করবে। পরিবেশদূষণ কমানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে সরকার নতুন বাণিজ্যিক, শিল্প ও সরকারি ভবনে ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন বাধ্যতামূলক করার নিয়মটি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করছে। বিশেষ করে যেসব স্থাপনার বৈদ্যুতিক লোড ১০ কিলোওয়াটের বেশি, সেগুলোর ওপর এই নজরদারি রাখা হচ্ছে।

উদ্যোক্তারা মনে করছেন, ছাদভিত্তিক সৌর প্যানেল স্থাপনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি সহজ ঋণ সুবিধা চালু করা দরকার। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তা এবং শহরাঞ্চলের আবাসিক গ্রাহকদের জন্য এ ধরনের আর্থিক সুবিধা দেওয়া গেলে বিনিয়োগ দ্রুত বাড়বে।

তবে প্রতি ইউনিটে পাঁচ থেকে ছয় টাকা সাশ্রয়ের হিসাবটি সংশ্লিষ্ট এলাকার বিদ্যুতের কার্যকর ট্যারিফ এবং প্যানেল স্থাপন ও পরিচালনার সার্বিক ব্যয়ের সাথে সমন্বয় করেই বিবেচনা করতে হবে।

চলতি অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই বিশাল আর্থিক বোঝা কমাতে নবায়নযোগ্য খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সৌর, বায়ু ও বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট সক্ষমতার ২০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বাংলাদেশ।