ড. মাহরুফ চৌধুরী
মে ১৩, ২০২৬, ১২:১৯ পিএম
ড. মাহরুফ চৌধুরী, ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনীতি কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যম নয়, বরং এটি ভাষা, প্রতীক এবং মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের এক জটিল ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দৃশ্যমান রাজনৈতিক বক্তব্যের আড়ালে প্রায়ই কাজ করে জনমত নিয়ন্ত্রণের এক সুপরিকল্পিত বয়ান। এই বাস্তবতাকে ‘উপ্ত-সুপ্ত-গুপ্ত-লুপ্ত’ নামক একটি বিশ্লেষণী কাঠামোর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন গবেষক ড. মাহরুফ চৌধুরী।
তার মতে, রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা কেবল তথ্য প্রকাশ করে না, বরং এটি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে বৈধতা দিতে এবং প্রতিপক্ষকে অবমাননা করতে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ব্রিটিশ ভাষাতাত্ত্বিক নরম্যান ফেয়ারক্লাফের তত্ত্বের আলোকে দেখা যায় যে, ক্ষমতা ও ভাষার সম্পর্ক কখনোই নিরপেক্ষ নয়। রাজনৈতিক ভাষা এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে একটি পক্ষকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং অন্য পক্ষকে ‘অপর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। ড. মাহরুফ চৌধুরী তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, ক্ষমতার কেন্দ্র যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তারা অনেক সময় ভাষা ও বয়ানের মাধ্যমেই ঠিক করে দেন কোনটি গ্রহণযোগ্য সত্য।
ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশির সাংস্কৃতিক আধিপত্য তত্ত্বের মতোই, শাসকগোষ্ঠী কেবল বলপ্রয়োগ নয়, বরং মানুষের সম্মতি উৎপাদনের মাধ্যমে নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখে।রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার এই প্রক্রিয়াটি মূলত চারটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপটি হলো ‘উপ্ত’, যেখানে জনগণের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট ধারণা বা ভয়ের বীজ বপন করা হয়। এখানে আক্রমণ সরাসরি হয় না, বরং সচেতনভাবে কিছু শব্দ ও প্রতীক ছড়িয়ে দেওয়া হয় যা ধীরে ধীরে মানুষের মনে অবিশ্বাস তৈরি করে।
এর ফলে রাজনীতি আর কেবল নীতিগত আলোচনার জায়গা থাকে না, বরং এটি নৈতিক বৈধতার এক লড়াইয়ে পরিণত হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সময় ‘রাজাকার’, ‘স্বৈরাচার’ বা ‘দেশবিরোধী’ লেবেলিং এই প্রক্রিয়ারই অংশ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
দ্বিতীয় ধাপটি হলো ‘সুপ্ত’, যেখানে জনমনে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ক্লান্তি তৈরি করা হয়। কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের দাবি উঠলে তাকে সরাসরি দমন না করে বরং সময়ক্ষেপণ বা বিভ্রান্তিকর আশ্বাসের মাধ্যমে নিস্তেজ করে দেওয়া হয়। এর ফলে মানুষ প্রতিবাদী শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং বিশ্বাস করতে শুরু করে যে পরিবর্তন সম্ভব নয়। ড. মাহরুফ চৌধুরী জুলাই সনদের প্রসঙ্গ টেনে দেখিয়েছেন কীভাবে দাবিগুলোকে আংশিক স্বীকৃতি বা অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মাধ্যমে মন্থর করে দেওয়ার চেষ্টা চলে।
তৃতীয় ধাপে ‘গুপ্ত’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অন্তরাল থেকে অপপ্রচার ও চরিত্রহননের কাজ পরিচালিত হয়। ডিজিটাল যুগে এই স্তরটি আরও শক্তিশালী হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া, বট-নিয়ন্ত্রিত প্রচারণা এবং বিকৃত তথ্যের মাধ্যমে সত্য ও মিথ্যার সীমানা ঝাপসা করে দেওয়া হয়। সর্বশেষ স্তর হলো ‘লুপ্ত’, যেখানে প্রতিপক্ষকে জনপরিসর থেকেই মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়েরে বুর্দিয়োর প্রতীকী ক্ষমতা ধারণার মতো, এখানে ভাষাগত দমনের মাধ্যমে মানুষের চেতনাকেই পরিবর্তন করে দেওয়ার প্রয়াস থাকে।
তবে ইতিহাসের গভীর সত্য হলো, ক্ষমতার এই একমুখী ভাষা সবসময় স্থায়ী হয় না। ড. মাহরুফ চৌধুরীর মতে, মানুষের জমে থাকা বঞ্চনা ও ক্ষোভ একসময় প্রতিরোধের ভাষায় রূপান্তরিত হয়। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, শাসকের আরোপিত ভাষার বিপরীতে জনগণ নিজস্ব বিকল্প ভাষা ও স্লোগান তৈরি করেছে। যখন প্রশ্ন করার অধিকার সংকুচিত হয়, তখন স্লোগান বা দেয়াললিখনই ইতিহাসের বিকল্প ভাষা হয়ে দাঁড়ায়। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি মূলত সচেতন ও সমালোচনামুখর নাগরিক সমাজের মধ্যেই নিহিত থাকে, যারা প্রচারণার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যকে শনাক্ত করতে সক্ষম।