বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬,
ঐতিহাসিক সম্প্রীতি

দুর্গাপূজার ইতিহাসে বাংলার মুসলমানদের অবদান কতটা?

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২১, ২০২৬, ০১:০২ পিএম

দুর্গাপূজার ইতিহাসে বাংলার  মুসলমানদের অবদান কতটা?

সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে বসন্তকালের বাসন্তী পূজাই ছিল দেবী আরাধনার প্রাচীন রূপ। কিন্তু বিশেষ ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সেই পূজা শরৎকালের শারদীয় উৎসবে রূপ নেয় এবং কালক্রমে তা পরিণত হয় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের এক অনন্য সার্বজনীন মিলনমেলায়।

ধর্মীয় গ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ে যুগে যুগে ধর্মের অবক্ষয় রোধ এবং দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে ঈশ্বরের আবির্ভাবের কথা বলা হয়েছে। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে সত্যযুগে মহিষাসুরের অত্যাচারের বিরুদ্ধে দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে দশভুজা রূপ ধারণ করে মহাশক্তি দুর্গার প্রকাশ ঘটেছিল। সেই সত্যযুগে রাজ্যহারা রাজা সুরথ ঋষি মেধার পরামর্শে মাটির প্রতিমা গড়ে প্রথম পূজা করেছিলেন, যা বাসন্তী পূজা নামে পরিচিত।

ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী পূজা মূলত চৈত্র বা বসন্তকালে হওয়ার বিধান থাকলেও এর পট পরিবর্তন ঘটেছিল রামচন্দ্রের মাধ্যমে। কৃত্তিবাসী রামায়ণ ও কালিকা পুরাণ অনুসারে, লঙ্কায় রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ের জন্য শ্রী রামচন্দ্র অসময়ে শরৎকালে দেবীকে জাগ্রত করে আরাধনা করেছিলেন। অসময়ে জাগ্রত করার এই ঘটনাকেই শাস্ত্রে অকাল বোধন বলা হয়।

পৌরাণিক এই ঘটনার বহু শতাব্দী পর ১৫৮৩ সালে মোঘল সম্রাট আকবরের আমলে রাজশাহীর তাহেরপুরে শারদীয় পূজার এক নজিরবিহীন সূচনা হয়। দিল্লির শাসনকে কার্যত উপেক্ষা করে চলা বারো ভূঁইয়ার অন্যতম শক্তিশালী সদস্য রাজা কংসনারায়ণ রায়বাহাদুর নিজের নাম অমর করতে এক মহাযজ্ঞের সংকল্প করেন। তিনি বাংলার তৎকালীন স্মৃতিশাস্ত্রবিদদের আমন্ত্রণ জানালে নাটোরের পণ্ডিত রমেশ শাস্ত্রী শরৎকালে দেবী দুর্গার মহাযজ্ঞের পরামর্শ দেন।

সেই মহাযজ্ঞে তৎকালীন হিসেবে ৯ লাখ এক টাকা ব্যয় হয়েছিল, যা বর্তমান আর্থিক মূল্যে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার সমতুল্য। তাহেরপুরের রাজবাড়ির সংলগ্ন এলাকায় দুর্গার জন্য নির্মাণ করা হয় রাজকীয় মন্দির এবং স্বর্ণের প্রতিমা। গৌড়, মিথিলা, কাশী, দ্রাবিড় ও বেনারস থেকে হাজার হাজার প্রখ্যাত ব্রাহ্মণ ও সাধুসন্তকে আমন্ত্রণ জানিয়ে শাল, সোনার পাত্র ও বিপুল অর্থ দক্ষিণা দেওয়া হয়। মাসব্যাপী খাদ্য বিতরণের পাশাপাশি প্রজাদের বিনোদনে দূর-দূরান্ত থেকে আসা নাট্যদল দিয়ে চণ্ডীর মহিমা ও রামায়ণের পালাগান পরিবেশন করা হয়। তবে বিপুল জাঁকজমক থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের প্রাসাদের ভেতরে গিয়ে প্রতিমা দর্শন বা সরাসরি পূজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল না।

পরবর্তীতে ১৭৯০ সালে বারোয়ারি দুর্গাপূজার প্রচলন ঘটলেও তা ধারাবাহিক বা সার্বজনীন ছিল না। শারদীয় দুর্গাপূজার প্রকৃত সার্বজনীন যাত্রা শুরু হয় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে।

১৯২৬ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক সহযোগী স্বাধীনতা সংগ্রামী অতীন বসু কলকাতার শিমলা পল্লীতে প্রথম ঘোষণা করেন যে দুর্গাপূজায় কোনো বর্ণপ্রথা থাকবে না। সেখানে সব জাতপাতের মানুষ এক পংক্তিতে বসে ভোগ গ্রহণ করবেন এবং পূজায় অঞ্জলি দিতে পারবেন।

সেই থেকে দুর্গাপূজা নিছক ধর্মীয় আচারের গণ্ডি পেরিয়ে ব্রিটিশ বিরোধী ঐক্য ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার এক যৌথ প্রতিরোধে রূপ নেয়। তৎকালীন বাংলায় জেলায় জেলায় গঠিত সার্বজনীন দুর্গোৎসব উদযাপন কমিটিতে মুসলিম ব্যক্তিত্বদেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কালজয়ী আগমনী কবিতায় দুর্গাকে কোনো পৌরাণিক দেবীর বদলে ব্রিটিশ শোষকরূপী অসুর বিনাশকারী এক বিপ্লবী জননীর রূপকে উপস্থাপন করেন। তিনি পূজার বিশেষ সংখ্যার জন্য একের পর এক গান ও কবিতা লিখেছেন।

তৎকালীন নদিয়া ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ মৌলভী শামসুদ্দিন আহমেদ ছিলেন স্থানীয় দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক। একইভাবে কলকাতার রাজনীতিবিদ সৈয়দ বদরুদ্দোজা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন দুর্গাপূজা কমিটির সভাপতি ও উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ব্রিটিশদের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার দমননীতির বিরুদ্ধে জনসমাজকে সংগঠিত করতে এই অঞ্চলে মেলার আশ্রয় নেওয়া হতো। যেমন ১৯০৯ সালে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে আবদুল জব্বার সওদাগর আয়োজন করেছিলেন জব্বারের বলি খেলা, যার নেপথ্যে ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য যুবসমাজকে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করার সুদূরপ্রসারী কৌশল।

বিভিন্ন ধর্মে মানুষের আত্মিক শুদ্ধতা ও সম্প্রীতিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ে যেমন শুদ্ধ চিত্তে নিবেদিত সামান্য পাতা, ফুল বা জলের গ্রহণযোগ্যতার কথা বলা হয়েছে, তেমনি ইসলামিক ইতিহাসে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার রক্ষা ও সৌহার্দ্যের সুস্পষ্ট নজির রয়েছে। ঐতিহাসিক সূত্র মতে, আরবের নাজরান অঞ্চল থেকে আগত খ্রিস্টান প্রতিনিধিরা মদিনায় এলে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মসজিদে নববীতেই নিজ রীতিতে প্রার্থনা সম্পন্ন করার সুযোগ দিয়েছিলেন।

এমনকি পারস্যের নওরোজের দিনে উপহার হিসেবে পাঠানো মিষ্টি গ্রহণ করে হজরত আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পারস্পরিক সম্প্রীতি ও মধুর দিনযাপনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন। বাংলার মাটিতে ধর্ম যার যার হলেও উৎসবের আনন্দ ও সৌহার্দ্য সবার—এই ঐতিহাসিক পরম্পরাতেই শারদীয় দুর্গাপূজা আজ সার্বজনীন রূপ পেয়েছে।