রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
শিশুর মানসিক বিকাশ

শিশুর মানসিক বিকাশে সংস্কৃতিচর্চা জরুরি

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ০৯:৩৫ এএম

শিশুর মানসিক বিকাশে সংস্কৃতিচর্চা জরুরি

প্রতিদিন পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন, নম্বর বসানো কিংবা রিপোর্ট কার্ডে সই করার চেনা আনুষ্ঠানিকতার বাইরেও এক অদৃশ্য প্রাপ্তি থাকে যা কেবল অনুভূতির মাধ্যমে স্পর্শ করা যায়। প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক সিলেবাসের বাইরে সন্তানের মানসিক বিকাশে একটি উন্মুক্ত জানালা তৈরি করে দিতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এক অভিজ্ঞ শিক্ষক। পাঠ্যবইয়ের একমুখী পড়াশোনার পাশাপাশি গান, আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন কিংবা অভিনয়ের মতো সৃজনশীল সাংস্কৃতিক মাধ্যমের সান্নিধ্য শিশুর ভেতরে সহমর্মী মানুষ গড়ে তোলে বলে তিনি অভিমত দেন।

নম্বর কখনো পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি করে না, আনন্দ ও আত্মতৃপ্তিই জীবনকে সমৃদ্ধ করে। শ্রেণিকক্ষের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, গণিতে আটানব্বই নম্বর পেয়ে প্রথম হওয়া এক শিক্ষার্থীকে টিফিনের অবসরে প্রায়ই একা বিষণ্ণ বসে থাকতে দেখা যায়, যা তার সামাজিক যোগাযোগে চরম দ্বিধাদ্বন্দ্ব প্রকাশ করে। বিপরীতে তুলনামূলক কম নম্বর পাওয়া আরেক শিক্ষার্থী সুরের জাদুতে পুরো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমের অতিরিক্ত চাপ কমাতে প্রত্যেক শিশুর জীবনে একটি মানসিক মুক্তির আশ্রয় প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

পরীক্ষার ভীতিতে ঘরকুনো হয়ে কান্না করা এক শিক্ষার্থীকে তার অভিভাবক চিত্রাঙ্কন বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছিলেন। ছয় মাস পর সেই শিশু জানায়, মানসিক চাপ বা খারাপ লাগার মুহূর্তে ক্যানভাসে পাহাড়ের ছবি আঁকলে তার মন হালকা হয়ে যায়। কোনো ধরনের ওষুধের বদলে তুলি আর রঙের স্পর্শই তার মানসিক সুস্থতার প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। শৈশবে সাংস্কৃতিক চর্চার অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে আত্মবিশ্বাস ও প্রতিকূলতা মোকাবিলার শক্তি জোগায়।

দুই শত দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে অবলীলায় আবৃত্তি করার সাহসিকতা অর্জনকারী শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে যেকোনো মৌখিক পরীক্ষা বা পেশাগত সাক্ষাৎকারের বোর্ডে সহজে আত্মবিশ্বাস হারায় না। একইভাবে শাস্ত্রীয় নৃত্যের অনুশীলনে বারবার পদক্ষেপ ভুল হলেও পুনরায় নতুন উদ্যমে শুরু করার যে ধৈর্য সৃষ্টি হয়, তা জীবনের যেকোনো সংকটে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা জোগায়। অতিরিক্ত মুঠোফোন ও ক্ষতিকর সামাজিক মাধ্যমের রিলস দেখার আসক্তি থেকে শিশুকে মুক্ত রাখতে যন্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেয়ে তার হাতে বাদ্যযন্ত্র বা রংতুলির মতো বিকল্প তুলে দেওয়া অনেক বেশি কার্যকর।

সুর ও সৃষ্টির নেশায় ডুবে থাকলে ডিজিটাল পর্দার ক্ষতিকর আকর্ষণ থেকে শিশু স্বাভাবিকভাবেই দূরে থাকে। ভবিষ্যতে ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষার্থী চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হিসেবে পেশাগত প্রতিষ্ঠা পেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ কর্মজীবনের অস্বাভাবিক কাজের চাপ ও একাকীত্বে বিদ্যালয় জীবনে রপ্ত করা শৈল্পিক চর্চাই তাকে মানসিকভাবে রক্ষা করে। সনদের মাধ্যমে জীবিকা নিশ্চিত হলেও সংস্কৃতিই মূলত অন্তরের ক্ষুধা মেটায় এবং জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করে। সবাইকে পেশাদার শিল্পী হতে হবে এমন নয়, বরং ভেতরের মানবিক সত্তাটিকে টিকিয়ে রাখতে গান, কবিতা, অভিনয় ও চিত্রকলা মানসিক প্রশ্বাসের মতো কাজ করে।

অভিভাবকদের সময়ের সীমাবদ্ধতার প্রশ্নে তিনি জানান, ব্যস্ততম রুটিনের মধ্যেও সপ্তাহে মাত্র দুই ঘণ্টা সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ দেওয়া সম্ভব হলে তা ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্ণতা প্রতিরোধে কার্যকর ঢাল হিসেবে কাজ করবে। এটি শিশুকে কৃত্রিম যন্ত্রে রূপান্তর না করে সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে টিকে থাকতে সাহায্য করে। কেবল প্রথম হওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতায় আবদ্ধ না রেখে শিশুর সম্ভাবনাকে প্রস্ফুটিত করার মাধ্যমে জীবনব্যাপী তার সৌরভ ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

পরীক্ষায় নম্বর সামান্য কম এলে অভিভাবক বকুনি দিতে পারেন, তবে হারমোনিয়ামে ধুলো জমলে কিংবা তুলির রং শুকিয়ে নিঃশেষ হলে মূলত শিশুর অবিকৃত শৈশবই কেড়ে নেওয়া হয়। রোবটের যুগে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি সৃষ্টিশীল চর্চায় যুক্ত রেখে সংবেদনশীল ও পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই আধুনিক সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।