রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ

জাতিসংঘে বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী

জাতীয় ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ১০:৫৮ এএম

জাতিসংঘে বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংস্কারমুখী ও বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে তুলে ধরতে নিউইয়র্ক যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অতীতে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় অর্থে বিপুলসংখ্যক সফরসঙ্গী নিয়ে দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান এবং অপ্রয়োজনীয় বৈঠকের আয়োজনের যে সংস্কৃতি প্রচলিত ছিল, এবার তাতে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত অত্যন্ত সীমিতসংখ্যক প্রতিনিধি নিয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ কার্যকর কূটনৈতিক লক্ষ্যে এই সফরে অংশ নিচ্ছেন সরকারপ্রধান।

বাংলাদেশের ১৭ বছরের ইতিহাসে এটিই কোনো সরকারপ্রধানের সংক্ষিপ্ততম জাতিসংঘ সফর। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রে প্রধানমন্ত্রীর পুরো সফরসূচি কাটছাঁট করা হয়েছে। পূর্বে ২১ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সফরের সম্ভাব্য পরিকল্পনা ছিল এবং নিউইয়র্কের বাইরে সান ফ্রান্সিসকো যাওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। তবে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী নিজেই সফর সংক্ষিপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেবেন তিনি এবং পরদিন অর্থাৎ ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার উদ্দেশে নিউইয়র্ক ত্যাগ করবেন।

সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে কৃচ্ছ্রসাধন ও অনাবশ্যক ব্যয় রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান। প্রটোকলের চিরাচরিত বহর কমানোর পাশাপাশি মাত্র দেড় শত টাকার সাধারণ খাবার গ্রহণ করে প্রশাসনিক ব্যয় সংকোচনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অপচয় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় সরকারি প্রশাসনেও জবাবদিহির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

এক কঠিন অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালে বেসরকারি খাতে তৈরি হওয়া অচলাবস্থা, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধির পরিস্থিতির মধ্যে বিএনপি সরকার গঠনের পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ শুরু হয়। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়ে উন্নত দেশগুলোতে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি দেখা দেয় এবং যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো দেশগুলো অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় চাপে পড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপে দেশে ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করেছে।

টানা তিন মাস কমার পর গত আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিগত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সাথে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও নেমে এসেছে ৭ শতাংশের ঘরে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের মুদ্রা মান হারালেও সতর্ক আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণে ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার মান স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

দায়িত্ব গ্রহণের সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের লুটপাট এবং অনিয়মের কারণে গভীর সংকট বিদ্যমান ছিল। ভুল নীতি ও অবকাঠামোগত সংকটে গ্রীষ্ম মৌসুমে তীব্র লোডশেডিং এবং গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। এই সংকট কাটাতে মধ্য মেয়াদে দেশে ১৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। প্রথম ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পর দ্বিতীয় ধাপে আরও ১৫০টি গ্যাসকূপ খনন করা হবে।

বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চালু রয়েছে। সরকার ২০২৮ সালের মধ্যে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং দীর্ঘ মেয়াদে মোট পাঁচটি টার্মিনাল চালুর মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এছাড়া ১৮ কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির নীতিগত অনুমোদন এবং চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণের জন্য ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতে কারিগরি সংস্কারের মাধ্যমে জাতীয় সঞ্চালন গ্রিডে ১ হাজার ৪৬ দশমিক ৭৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ যুক্ত করা হয়েছে। ভোলার গ্যাসভিত্তিক ৫০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও একটি আধুনিক সার কারখানা স্থাপনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে প্রাধান্য দিয়ে জাতীয় গ্রিডে নতুন ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে দেশের সব ডিজেলচালিত সেচপাম্পকে সৌরশক্তিতে রূপান্তরের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। গৃহস্থালির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রণোদনা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক-কর অব্যাহতি এবং ঢাকার আমিনবাজারে বর্জ্য থেকে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

বেসরকারি খাত পুনরুজ্জীবিত করতে বন্ধ থাকা কলকারখানা পুনরায় চালুর কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অতীতে মিথ্যা মামলা, কারখানায় ভাঙচুর ও নাশকতার কারণে যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল, তা দূর করতে প্রধানমন্ত্রী নিজে শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে প্রয়োজনীয় অনুশাসন জারি করেছেন। নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জীবনমান সুরক্ষায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বিভিন্ন জেলায় সরেজমিনে গিয়ে সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়া প্রত্যক্ষ করছেন এবং সে অনুযায়ী নীতি প্রণয়ন করছেন। এর পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকরের সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সাত মাসের এই প্রশাসনিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের পাশাপাশি একাধিক আন্তর্জাতিক ফোরামে অংশ নেবেন সরকারপ্রধান। এসব উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে টেকসই উন্নয়ন, ভবিষ্যৎ মহামারি প্রতিরোধ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং পরমাণু অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণের মতো বৈশ্বিক ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হবে। এছাড়া রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে বিশেষ কূটনৈতিক আলোচনার আয়োজন করছে বাংলাদেশ। সফরে একাধিক রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সূচি চূড়ান্ত হয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, কুয়েতের যুবরাজ শেখ সাবাহ আল-খালিদ আল-সাবাহ, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেঙ্কোভিচ এবং সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে সরকারপ্রধানের পৃথক আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে পারে।

এছাড়া জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্তোনিও কস্তা, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং বোয়িং গ্লোবালের প্রেসিডেন্ট ব্রেন্ডান নেলসনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তুতি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে আয়োজিত আনুষ্ঠানিক নৈশভোজেও বাংলাদেশের সরকারপ্রধান অংশ নেবেন। রাষ্ট্রীয় কৃচ্ছ্রসাধন ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক সংস্কারের বার্তা নিয়ে নিউইয়র্কের বিশ্বমঞ্চে একটি আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের উপস্থিতি নিশ্চিত করবে এই সফর।