রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
কৃষি সম্ভাবনা

মিয়াজাকি আম চাষে নতুন বাণিজ্যিক দিগন্ত উন্মোচন

কৃষি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ১১:৩০ এএম

মিয়াজাকি আম চাষে নতুন বাণিজ্যিক দিগন্ত উন্মোচন

বিশ্বের অন্যতম দামি ও বিরল ফল হিসেবে পরিচিত জাপানের মিয়াজাকি আম সফলভাবে ফলিয়ে দেশের উদ্যানপালনে নতুন চমক দেখিয়েছেন নাটোরের কৃষি উদ্যোক্তা। নাটোর সদর উপজেলার হাসরা নাটোরে অবস্থিত কৃষিবিদ নার্সারির সমন্বিত ফলবাগানে এই জাতের আম বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হচ্ছে। বিগত ২০১৪ সালে জাপান থেকে সংগৃহীত সায়ন নিয়ে নিজ পৈতৃক ভিটায় প্রথমে পরীক্ষামূলক দুটি গাছ তৈরি করা হয়। পরবর্তীকালে দীর্ঘ পঁচিশ বছরের নার্সারি পরিচালনার অভিজ্ঞতার আলোকে শহরের কাছে প্রধান বাগানে আড়াই বছর বয়সী কলমের গাছ সম্প্রসারণ করে নিবিড় চাষাবাদ শুরু করা হয়েছে।

ফলনশীল বাগানে প্রতিটি গাছই এখন উজ্জ্বল লাল রঙে রঙিন। জাপানের দক্ষিণাঞ্চল কিউশু দ্বীপের আবহাওয়া কিছুটা উষ্ণপ্রধান হওয়ায় বাংলাদেশের মাটির সাথে এর ভালো উপযোগিতা তৈরি হয়েছে। জাপানে ডিম্বাকার এই আমকে সূর্যের ডিম বা ‍‍`তাইও নো তামাগো‍‍` বলা হয়। মিয়াজাকি আম মূলত জাপানি অ্যাপল ম্যাঙ্গো হিসেবে পরিচিত। পশ্চিমাকাশে সূর্য অস্ত যাওয়ার সময়কার রক্তিম লাভার মতো দীপ্তিময় রূপ ধারণ করার কারণেই এটিকে সূর্যের ফল হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। পরিপক্ব অবস্থায় প্রতিটি আমের ওজন প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। আমের কাঙ্ক্ষিত গুণমান ও রং নিশ্চিত করতে গাছে নির্দিষ্ট ক্যানোপি ব্যবস্থাপনা ও স্ক্রিনিং পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। একটি ডাল বা পুষ্পমঞ্জুরিতে একাধিক ফল এলেও কেবল একটি বা দুটি অক্ষত ও সুষম আম রেখে বাকিগুলো আগেই ছাঁটাই করে দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী ফলের খোসার অন্তত ৩৫ শতাংশ অংশে গাঢ় লাল আভা না এলে সেটি খাঁটি মিয়াজাকির মানদণ্ড পায় না। সূর্যালোক সরাসরি ফলের গায়ে পৌঁছালে লালচে আভা ক্রমশ বিস্তৃত হয়, আর ছায়াযুক্ত অংশে কিছুটা সবুজ ভাব থেকে যায়। ফুল ফোটা থেকে ফল পরিপক্ব হতে ফার্টিলাইজেশনের সময়সূচির ভিন্নতার কারণে ফসল তুলতে সাত থেকে দশ দিনের ব্যবধান তৈরি হয়।

বাগান বিন্যাসের ক্ষেত্রে প্রথাগত ঘন চাষের বদলে আট হাত বা প্রায় বারো ফুট পর পর চারা রোপণ করা হয়েছে। এই হিসেবে এক বিঘা বা ৩৩ শতক জমিতে সর্বোচ্চ ১০০টি চারা রোপণ করা যায়। গাছে ছাতার মতো গোল ক্যানোপি বা ঝোপালো আকার রাখলে একদিকে ফলন ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে প্রচণ্ড কালবৈশাখী ঝড় ও দমকা বাতাসের ক্ষতি থেকে শাখা-প্রশাখা সুরক্ষিত থাকে। এছাড়া মাটিতে সরাসরি চারা রোপণের পূর্বে নিচু জলমগ্ন জমি ও বেলেমাটি সম্পূর্ণ পরিহার করতে হয়। প্রতি ৪০ কেজি পচা জৈব সারের বিপরীতে মাত্র এক কেজি রাসায়নিক সারের ভারসাম্যপূর্ণ মিশ্রণ মাটির পিএইচ মান ঠিক রেখে দীর্ঘমেয়াদি উর্বরতা ধরে রাখে। নিরাপদ ও দাগমুক্ত ফল পেতে প্রতিটি আমে গাছে থাকা অবস্থায় কাগজের বিশেষ ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রায় পৌনে চার টাকা বা চার টাকা খরচের এই ব্যাগ ব্যবহারের ফলে পোকা ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করার অতিরিক্ত খরচ বহুলাংশে কমে যায়। কেবল ফুল আসা থেকে গুটি বাঁধা পর্যন্ত হপার পোকা ও ছত্রাকের আক্রমণ ঠেকাতে তিন থেকে চারবার পরিমিত বালাইনাশক স্প্রে করতে হয়। তাছাড়া ব্যাগিং করার কারণে বাদুড় বা পাখির উৎপাত প্রতিরোধে কোনো ক্ষতিকর বিষাক্ত জাল ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না, যা জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে। অন্যান্য দেশীয় আম কাটার পর দ্রুত আয়রনের কারণে কালো হয়ে গেলেও মিয়াজাকি দীর্ঘক্ষণ স্বাভাবিক ও সতেজ থাকে।

বাণিজ্যিক বাজারজাতে শুরুতে প্রতি কেজি আম দুই হাজার টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে এর প্রাপ্তি সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে চলে এসেছে। জাপানি প্যাকেজিংয়ের আদলে জোড়া হিসেবে আকর্ষণীয় মোড়কে সেরা মানের আম বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকায়। এছাড়া সাধারণ এ-গ্রেড আম প্রতি কেজি ৫০০ টাকা এবং বি-গ্রেড আম কেজি প্রতি ৩০০ টাকায় বাজারজাত করা হচ্ছে। নতুন চাষিদের জন্য খামারে তিন ধরনের কলম চারা পাওয়া যাচ্ছে, যার মূল্যমান রাখা হয়েছে ১২০ টাকা, ২০০ টাকা এবং ২৫০ টাকা। অভিজ্ঞ উদ্যোক্তারা নতুন বাগান সম্প্রসারণে অতিরিক্ত জায়গা একসাথে নেওয়ার চেয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে পরীক্ষামূলক আবাদ শুরু করে ধাপে ধাপে বাণিজ্যিক উৎপাদনের পরামর্শ দিচ্ছেন।