সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম
ধানসহ প্রচলিত অন্য ফসলের তুলনায় কম খরচে বেশি মুনাফা আসায় যশোরের বিস্তৃত ফসলি মাঠে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে লতিরাজ জাতের পানি কচুর বাণিজ্যিক চাষাবাদ। জেলা শহর থেকে প্রায় সাড়ে সতেরো কিলোমিটার উত্তরে এবং বাঘারপাড়া উপজেলা সদর থেকে পনেরো কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত বন্দবিলা ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে মাঠের পর মাঠ এই উচ্চফলনশীল জাতের আবাদ হচ্ছে। বাঘারপাড়ার নয়টি ইউনিয়নসহ পুরো জেলার আটটি উপজেলাতেই কমবেশি এই সবজির ফলন হচ্ছে। দেশে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের কচু ও লতি চাষ হলেও শুধু যশোরেই আটশত পঁচাত্তর হেক্টর জমিতে এই অর্থকরী ফসলের চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে।
স্বল্প বালাইনাশক ও দীর্ঘস্থায়ী ফলনই লতিরাজকে কৃষকের কাছে লাভজনক করে তুলেছে। পানি কচুর বৈজ্ঞানিক নাম কলোক্যাসিয়া এসকুলেন্টা এবং এটি মূলত অ্যারাসি গোত্রভুক্ত একবীজপত্রী প্রাচীন উদ্ভিদ। দেশীয় নারিকেলি কচু, শোলা কচু, জাতকচু, বাঁশকচু ও কাঠকচুর মতো নানা প্রজাতির ভিড়ে অধিক উৎপাদনের কারণে লতিরাজ উপসী জাতটি চাষিদের প্রথম পছন্দে পরিণত হয়েছে। এই জাতের অন্যতম বিশেষত্ব হলো এতে ক্ষতিকর ক্যালসিয়াম অক্সালেটের মাত্রা অত্যন্ত কম থাকে, ফলে খাওয়ার সময় গলায় কোনো ধরনের চুলকানি বা অস্বস্তি তৈরি হয় না এবং রান্নার সময় তা সুষমভাবে দ্রুত সেদ্ধ হয়। লতিরাজ আবাদের জন্য মূলত বৃষ্টি ও সেচের পানি সহজে ধরে রাখতে পারে এমন মাঝারি নিচু থেকে মাঝারি উঁচু জমির পলি-দোআঁশ ও এঁটেল-দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। জমি প্রস্তুতির ক্ষেত্রে তিন থেকে চার বার গভীর চাষ ও মই দিয়ে মাটির উপরিভাগ সমান ও থকথকে কাদাময় করে নিতে হয়। চারা হিসেবে পূর্ণবয়স্ক কচু গাছের গোড়া থেকে বের হওয়া কন্দাল চারা বা গুড়িচারা ব্যবহার করা হয়, যাকে স্থানীয় কৃষকেরা `তেউর` বলে ডাকেন। রোপণের সময় তেউরের মাঝের দুটি কচি পাতা রেখে বাকি সব পাতা, শিকড় ও কাণ্ডের একাংশ ছেঁটে ফেলা হয়। বছরে মূলত তিন মৌসুমে এই চারা লাগানো যায় — আগাম ফলনের জন্য আশ্বিন ও কার্তিক মাসে, মূল বাণিজ্যিক মৌসুমের জন্য অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে এবং নাবি ফলনের জন্য মধ্য ফাল্গুন থেকে মধ্য বৈশাখে।
সারিবদ্ধভাবে রোপণ করলে হেক্টর প্রতি প্রায় সাতাশ থেকে আটত্রিশ হাজার তেউরের প্রয়োজন হয়, যা বিঘা প্রতি প্রায় পাঁচ হাজার এবং শতকে প্রায় দেড় শতাধিক চারার সমান। সারি থেকে সারির দূরত্ব রাখা হয় প্রায় দুই ফুট এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব থাকে দেড় ফুট। চারা রোপণ থেকে শুরু করে পুরো জীবনকালে জমিতে নিয়মিত অগভীর ও বহমান সেচের পানি ধরে রাখা জরুরি। পরিচর্যার সময় চাষিরা যখন আগাছা পরিষ্কার করতে কাদাজলে পা ফেলে চলাচল করেন, তখন পানির নিচে থাকা বিভিন্ন পোকা বিনষ্ট হয়, যা জমিতে রাসায়নিক বালাইনাশকের নির্ভরতা বহুলাংশে কমিয়ে দেয়। কেবল মাকড়সা, লেদাপোকা ও পাতার দাগ রোগ দেখা দিলে সামান্য পরিমাণ সুরক্ষা ব্যবস্থা নিতে হয়। রোপণের প্রায় দুই মাসের মাথায় অর্থাৎ ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে গাছে প্রথম লতি কাটা শুরু হয়। লতিরাজের প্রতিটি লতি গাঢ় সবুজ, মাংসল ও গিঁটযুক্ত এবং গড়ে ৯০ থেকে ১০০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। কৃষকেরা প্রতি আট থেকে দশ দিন পর পর জমি থেকে লতি সংগ্রহ করেন এবং এই প্রক্রিয়া একটানা সপ্তম মাস পর্যন্ত সচল থাকে। একই জমি ও গাছ থেকে মোট তিনটি ধাপে অর্থনৈতিক মুনাফা আসে — প্রথম ধাপে দীর্ঘ সাত মাস ধরে লতি বিক্রি, দ্বিতীয় ধাপে পাঁচ থেকে ছয় সেন্টিমিটার লম্বা সুস্বাদু কচুর ফুল বিক্রি এবং সবশেষে গাছের গোড়ায় জমে থাকা পুষ্ট কাণ্ড বা কন্দ উত্তোলন। প্রতি হেক্টর জমি থেকে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ টন লতি এবং ফসল চক্রের শেষ ভাগে ১৮ থেকে ২২ টন কন্দ বা মোথা উৎপাদিত হয়।
ক্ষেত থেকে লতি ও ফুল তুলে গৃহস্থ বাড়ির নারীরা তা কাদামুক্ত করে ধুয়ে বাছাই ও গ্রেডিং শেষে নির্দিষ্ট ওজনে আঁটি বাঁধেন। এরপর তা সরাসরি চলে যায় যশোর-মাগুরা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী বন্দবিলার পুলেরহাট সবজি বাজারে। শনিবার ও মঙ্গলবার প্রধান হাটবার হলেও এই আড়তে প্রতিদিন ভোর থেকেই পাইকারি কেনাবেচা চলে। পাইকারি মোকামে প্রতি কেজি কচুর ফুল ২৫ থেকে ৩০ টাকায়, মোটা লতি ৩০ থেকে ৪০ টাকায় এবং চিকন লতি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়। প্রতিদিন এই মোকাম থেকে গড়ে তিনশত থেকে চারশত মণ লতি রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় চালান হচ্ছে এবং প্রক্রিয়াজাত লতি আন্তর্জাতিক বাজারেও নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন